ক্ষমতা মানুষকে বদলায় না। ক্ষমতা মানুষের ভেতরের আসল চেহারা বের করে আনে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারায়নি। ক্ষমতা হজম করতে ব্যর্থ হয়েছে। বাইরের শত্রু দলটিকে ধ্বংস করেনি — ভেতরের চাটুকাররা করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জোট দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এই মুহূর্তে বিএনপির সামনে দুটো পথ — আওয়ামী লীগের ভুল থেকে শেখা, অথবা রিপিট করা। একজন আইনজীবী হিসেবে আমি ক্ষমতার কাঠামোগত সমস্যা নিয়ে কথা বলতে চাই। ব্যক্তি নয়, প্যাটার্ন নিয়ে।
এক. “গ্যাং অব ফোর” সিনড্রোম
শেখ হাসিনার শেষ দশ বছরে আওয়ামী লীগ চলেছে মূলত চারজনের হাতে — সালমান এফ রহমান, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান, এবং আরাফাত। দলের সিনিয়র নেতারা নিজেরাই এখন স্বীকার করছেন যে এই ক্ষুদ্র বৃত্ত শেখ হাসিনাকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল।
এই কাঠামো নতুন কিছু না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এর নাম “ইনফরমেশন কোকুন” — যেখানে নেতৃত্ব কেবল সেই তথ্য পায় যা অন্তঃবৃত্তের লোকজন পৌঁছাতে চায়। মাঠের খবর যায় না উপরে। উপর থেকে কেবল সিদ্ধান্ত নেমে আসে। যখন নেতৃত্ব বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, পতন তখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
প্রশ্ন হলো — তারেক রহমানের চারপাশে কারা থাকবেন? পরীক্ষিত রাজনৈতিক নেতা, নাকি আনুগত্যের বিনিময়ে পদপ্রাপ্ত লোকজন? সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে ক্রস-চেক হবে কি না — এটাই নির্ধারণ করবে বিএনপি আওয়ামী লীগের পথে হাঁটবে কি না।
দুই. গোয়েন্দা রিপোর্ট দিয়ে রাজনীতি চালানো
আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা পতনের পর স্বীকার করেছেন — দলটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পুরোপুরি ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। অনেক সিনিয়র নেতা জানতেনই না সিদ্ধান্ত কীভাবে হচ্ছে।
ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট ডেটা দেয়। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেয় না। ডেটা বলছে “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে।” কিন্তু রাস্তায় মানুষের ক্ষোভ তুঙ্গে। শেখ হাসিনা ডেটা বিশ্বাস করেছেন। রাস্তার মানুষকে বিশ্বাস করেননি। এই ফারাকটাই ৫ আগস্টের পূর্বশর্ত তৈরি করেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার কাজ সরকারকে নিরাপত্তা-সম্পর্কিত তথ্য দেওয়া। জনগণের মেজাজ বোঝা তাদের কাজ না — সেটা রাজনৈতিক দলের তৃণমূল কাঠামোর কাজ। যখন ইন্টেলিজেন্স ব্রিফিং তৃণমূলের জায়গা দখল করে নেয়, তখন দল জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বিএনপি কি ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের কথা শুনবে? নাকি ডিজিআইএফআই আর এনএসআই-র ব্রিফিং দিয়ে দেশ চালাবে?
তিন. ত্যাগী কর্মীদের ভুলে যাওয়া
এটি আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বিষাক্ত ভুল।
২০১৪ সাল থেকে তৃণমূলে দলীয় কাঠামো দখল করে নিয়েছিল সুবিধাবাদী আর এমপিদের পরিবারের লোকজন। যারা রাস্তায় মার খেয়েছে, মামলা সামলেছে, জেল খেটেছে — তাদের ঠেলে দেওয়া হইছে কোণায়। দলের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে ভেতর থেকে। ৫ আগস্টে যখন সংকট এলো, মাঠে দাঁড়ানোর মতো কর্মী ছিল না। কারণ যাদের দাঁড়ানোর কথা ছিল, তারা বহু আগেই কোণঠাসা।
বিএনপির মাঠের কর্মীরা ১৭ বছর ধরে মার খেয়েছে। জেল খেটেছে। মামলা সামলেছে। এখন ক্ষমতা এসেছে। প্রশ্ন একটাই — তারা কি পাবে? নাকি আবারও ব্যবসায়ী-লবিস্ট-পরিবার ঢুকে যাবে মাঠের কর্মীর জায়গায়?
ইতিহাস বলে — যে দল কর্মীকে মনে রাখে না, কর্মী সেই দলকে মনে রাখে না।
চার. বিরোধী দলকে শত্রু ভাবা
আওয়ামী লীগের কিছু নেতা বারবার শেখ হাসিনাকে বিরোধী দলকে নির্বাচনে আনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন — দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, পুলিশি নির্যাতন নিয়ে মানুষের ক্ষোভ জমছে। বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে পারলে সেই বাষ্প বের হয়ে যেত। শেখ হাসিনা সবুজ সংকেত দেননি।
হাসিনা বিএনপিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেননি। শত্রু হিসেবে দেখেছেন। এই একটা ভুলের মূল্য — একদলীয় নির্বাচন। একদলীয় নির্বাচনের মূল্য — জনবিচ্ছিন্নতা। জনবিচ্ছিন্নতার মূল্য — ৫ আগস্ট। মূল কথাটি সহজ। বিরোধী দল না থাকলে ক্ষোভের কোনো রাজনৈতিক চ্যানেল থাকে না। ক্ষোভ তখন রাস্তায় নেমে আসে। ক্ষোভ যখন রাস্তায় নামে, ক্ষমতা তখন শেষ হয়ে যায়। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে একাধিকবার প্রমাণিত।
ক্ষমতার ব্যাকরণ পাল্টায় না
এই চারটা ভুল আওয়ামী লীগের একার না।
পৃথিবীর প্রতিটি কর্তৃত্ববাদী দলের পতনের গল্প একই — ক্ষুদ্র বৃত্ত, বিচ্ছিন্ন নেতৃত্ব, তৃণমূলের মৃত্যু, এবং শেষ মুহূর্তে পরিত্যাগ। সরকার বদলায়। পদ্ধতি একই থাকে। প্রশ্ন হলো — বিএনপি কি এই প্যাটার্ন চিনতে পারবে?
এক — দলকে কয়েকজনের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। দুই — গোয়েন্দা রিপোর্ট দিয়ে দেশ চালানো যাবে না, মাঠের কর্মীর কথা শুনতে হবে। তিন — নিবেদিত কর্মীদের সরিয়ে ব্যবসায়ী-সুবিধাবাদী বসানো যাবে না। চার — বিরোধী দলকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে হবে, শত্রু হিসেবে নয়। প্রতিপক্ষবিহীন রাজনীতি গণতন্ত্র না — সেটা একনায়কতন্ত্রের ড্রেস রিহার্সাল।
ইতিহাস একবার সুযোগ দেয়। বিএনপি সেই সুযোগে দাঁড়িয়ে আছে। প্রশ্ন একটাই — শিখবে, নাকি পুনরাবৃত্তি করবে?
ফেরদৌস হোসেন, আইনজীবী , সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী এবং ডেটা প্রাইভেসি ও এআই আইন বিশেষজ্ঞ।
