আমেরিকা যখনই কোনো দেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করে, তার আগে একটি পরিচিত শব্দগুচ্ছ শোনা যায়— “গণতন্ত্র রক্ষা”, “মানবাধিকার”, “স্বৈরশাসকের পতন”। শব্দগুলো এতবার ব্যবহৃত হয়েছে যে, এখন আর সেগুলো নৈতিক অবস্থান নয়; বরং একটি পরীক্ষিত রাজনৈতিক স্ক্রিপ্ট। ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন তৎপরতাও সেই পুরোনো স্ক্রিপ্টেরই নতুন মঞ্চায়ন।
প্রশ্নটা খুব সোজা: গণতন্ত্র কি সত্যিই বন্দুকের নল থেকে আসে, নাকি তা আনে জনগণ? নাকি “গণতন্ত্র” শব্দটি কেবল শক্তিশালী রাষ্ট্রের স্বার্থ ঢাকার জন্য একটি সুবিধাজনক পর্দা? ভেনেজুয়েলা আজ কোনো নতুন সংকট নয়। দেশটি এক দশকের বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও সামাজিক অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। নিকোলাস মাদুরো নিঃসন্দেহে একজন স্বৈরশাসক—এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই স্বৈরশাসক কি গতকাল জন্ম নিয়েছেন?
মাদুরোর শাসনে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, বিরোধী দল দমন হয়েছে, সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছেন। এসব ঘটনার বেশির ভাগই নতুন নয়। তাহলে এতদিন ধরে আমেরিকার বিবেক কোথায় ছিল? হঠাৎ করে এখন কেন এই “নৈতিক উদ্বেগ”?
উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের তাকাতে হয় মানবাধিকার রিপোর্টে নয়, বরং মানচিত্রে—যেখানে ভেনেজুয়েলা বসে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল ভান্ডারের ওপর।
ইরাকেও বলা হয়েছিল গণবিধ্বংসী অস্ত্রের কথা। লিবিয়ায় বলা হয়েছিল মানবাধিকার। আফগানিস্তানে বলা হয়েছিল সন্ত্রাসবাদ। ইতিহাস আজ নির্মমভাবে দেখিয়েছে—এই নৈতিক ভাষার আড়ালে কী ভয়াবহ বাস্তবতা লুকিয়ে ছিল।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও গল্পটা ভিন্ন নয়। যখন কোনো দেশ— বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক হয়,মার্কিন প্রভাব বলয়ের বাইরে যেতে চায়, রাশিয়া বা চীনের মতো বিকল্প শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে,তখনই সে হয়ে ওঠে “গণতন্ত্রহীন”, “অবাধ্য” ও “আঞ্চলিক হুমকি”।
এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে আসে—সৌদি আরব কি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র?মিশরে মানবাধিকার পরিস্থিতি কি আদর্শ? ইসরায়েলের বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন কতটা কার্যকর? উত্তর সবার জানা। গণতন্ত্র নয়—আনুগত্যই আসল মানদণ্ড।
জাতিসংঘ সনদ স্পষ্টভাবে বলে— কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রে সামরিক হস্তক্ষেপ অবৈধ, যদি না তা আত্মরক্ষার প্রশ্ন হয় বা জাতিসংঘের স্পষ্ট অনুমোদন থাকে। ভেনেজুয়েলা কি আমেরিকার ওপর হামলা চালিয়েছে? জাতিসংঘ কি এই হস্তক্ষেপ অনুমোদন দিয়েছে?
উত্তর—না।
তাহলে এই হস্তক্ষেপ আসলে কী? এটি কি আন্তর্জাতিক আইন, না কি শক্তির শাসন? আজ যে আইন ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে ভাঙা হচ্ছে, কাল সেই একই যুক্তি ব্যবহার করে অন্য কোথাও হস্তক্ষেপ করা হবে। তখন আন্তর্জাতিক আইন আর ন্যায়বিচারের হাতিয়ার থাকবে না—তা হয়ে উঠবে দুর্বলদের জন্য নিয়ম, শক্তিশালীদের জন্য বিকল্প।
ভেনেজুয়েলাকে আলাদা করে দেখলে চলবে না। লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক স্মৃতিতে আমেরিকা মানেই— গুয়াতেমালায় সিআইএ প্রযোজিত সামরিক অভুত্থান। চিলিতে পিনোশে,নিকারাগুয়ায় কনট্রা যুদ্ধ,আর “ব্যানানা রিপাবলিক” রাজনীতি।এই অঞ্চলের মানুষ জানে—আমেরিকা আসে বন্ধু হয়ে, থাকে মালিক হয়ে, আর যায় ক্ষত রেখে।ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ গোটা লাতিন আমেরিকায় সেই পুরোনো ভয় ফিরিয়ে এনেছে। ফলে এটি শুধু একটি দেশের সংকট নয়; এটি একটি অঞ্চলের রাজনৈতিক স্মৃতির পুনর্জাগরণ।
তবে এখানে সবচেয়ে বিপজ্জনক যুক্তিটি আসে—মাদুরো স্বৈরশাসক, তাই বিদেশি হস্তক্ষেপ ন্যায্য। এই যুক্তি ভয়াবহ। কারণ আজ যদি বলা হয় “এই শাসক খারাপ, তাই হস্তক্ষেপ বৈধ”, তাহলে কাল কে ঠিক করবে—কোন শাসক খারাপ, আর কোনটা সহনীয়?এই যুক্তি মেনে নিলে— ইরাক ধ্বংস ন্যায্য,লিবিয়া ছিন্নভিন্ন হওয়া স্বাভাবিক,আফগানিস্তানের বিশৃঙ্খলা অনিবার্য। গণতন্ত্রের নামে একটি দেশের ভবিষ্যৎ অন্য দেশের হাতে তুলে দেওয়া গণতন্ত্র নয়—এটি আধুনিক উপনিবেশবাদ।
ভেনেজুয়েলা সংকটে সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—ভেনেজুয়েলার জনগণ ক্রমেই এই সমীকরণ থেকে বাদ পড়ছে। একদিকে মাদুরোর দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র, অন্যদিকে আমেরিকার বন্দুকধারী নৈতিকতা। মাঝখানে সাধারণ মানুষ—যাদের কথা বলে সবাই, কিন্তু যাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেউই মানতে চায় না।
এই দৃশ্য আমরা আগেও দেখেছি।
ইরাকের মানুষকে কেউ জিজ্ঞেস করেনি তারা যুদ্ধ চায় কি না।লিবিয়ার নাগরিকদের কেউ ভোট নেয়নি দেশ ভাঙার আগে।আফগান জনগণকে কেউ জিজ্ঞেস করেনি বিশ বছরের দখল তাদের কী দিল।ভেনেজুয়েলাতেও একই ঔপনিবেশিক মানসিকতা— “আমরাই জানি তোমাদের জন্য কী ভালো।” আমেরিকা যদি সত্যিই গণতন্ত্র চাইত, তবে প্রশ্ন উঠত— কেন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে অর্থনীতির শ্বাসরোধ করা হলো? কেন আলোচনার পথ বাদ দিয়ে সামরিক চাপ বেছে নেওয়া হলো? কেন বিরোধী রাজনীতিকে বাইরের ছাঁচে ফেলা হলো? উত্তর স্পষ্ট: কারণ লক্ষ্য গণতন্ত্র নয়, নিয়ন্ত্রণ।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা গ্লোবাল সাউথ-এর অংশ। বাংলাদেশ, আফ্রিকা বা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো জানে—আজ যদি ভেনেজুয়েলায় ‘গণতন্ত্র রক্ষা’-র নামে হস্তক্ষেপ বৈধ হয়, কাল একই যুক্তি ব্যবহার করে অন্য কোথাও চাপ তৈরি হতে পারে। এই ভয় বাস্তব, কারণ ইতিহাস বলছে—গ্লোবাল সাউথই বারবার পরীক্ষাগার হয়েছে বড় বড় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির। যখন আমেরিকা একদিকে মানবাধিকারের কথা বলে, অন্যদিকে নিজের স্বার্থে আন্তর্জাতিক আইন ভাঙে—তখন তার নৈতিক নেতৃত্ব ভেঙে পড়ে। গাজা, ইউক্রেন ও ভেনেজুয়েলার দিকে তাকালেই দ্বিচারিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে উন্নয়নশীল বিশ্বের কাছে আমেরিকা আর নৈতিক আদর্শ নয়; বরং একটি সুবিধাবাদী শক্তি।
ভেনেজুয়েলার সংকট বাস্তব। মাদুরোর শাসন সমস্যাযুক্ত। কিন্তু তার সমাধান ওয়াশিংটনের বোতাম চাপায় নয়। গণতন্ত্র আসে— জনগণের লড়াই থেকে,দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে,ভুল ও সংশোধনের মধ্য দিয়ে। ইতিহাস একটাই শিক্ষা দেয়—বাইরে থেকে চাপানো গণতন্ত্র কখনো টেকে না।ভেনেজুয়েলায় আজ যদি বন্দুকের জোরে “গণতন্ত্র” আসে, তবে তা গণতন্ত্র হবে না। তা হবে আরেকটি শক্তিধর সাম্রাজ্যের জয়গাথা—যার মূল্য শেষ পর্যন্ত দেয় সাধারণ মানুষ।
মাহমুদ নেওয়াজ জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।
