বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ (৩০ ডিসেম্বর), মঙ্গলবার সকাল ৬টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
বেগম খালেদা জিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির
নয়াবস্তি এলাকায়। তাঁর পারিবারিক নাম খালেদা খানম, ডাকনাম পুতুল; পরিবারে তিনি টিপসি ও শান্তি নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায়। পিতা ইস্কান্দর মজুমদার ও মাতা বেগম তৈয়বা মজুমদারের সন্তানদের মধ্যে তিনি তৃতীয়। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা খালেদা জিয়া প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শেষ করেন দশম শ্রেণিতেই। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর তাঁর সহধর্মিণী হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর হঠাৎ করেই এক গভীর রাজনৈতিক শূন্যতার মুখে পড়ে বিএনপি। সে সময় খালেদা জিয়া ছিলেন সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির বাইরে—দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকা সেনানিবাসে থাকা এক নীরব গৃহবধূ, যিনি স্বামীর হত্যার মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতেই হিমশিম খাচ্ছিলেন। কিন্তু নেতৃত্ব সংকটে পড়া বিএনপির একাংশ বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের বার্ধক্য ও নিষ্ক্রিয়তার প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়াকেই দলের ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখতে শুরু করে। কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন, নুরুল ইসলাম শিশু, একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মীর অব্যাহত অনুরোধ, দলের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ এবং স্বৈরাচারবিরোধী রাজনীতির বাস্তবতা এক সময় তাঁকে রাজনীতিতে যুক্ত হতে বাধ্য করে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও, দায়িত্বের ভার কাঁধে নিয়ে সেখান থেকেই শুরু গৃহবধূ খালেদা জিয়ার রাজনীতির পথে যাত্রা।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন মূলত সংগ্রামেরই আরেক নাম। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার পথে তাঁকে শুরুতেই দাঁড়াতে হয়েছে স্বৈরাচারের জেল-জুলুমের মুখোমুখি। এরশাদের পাতানো নির্বাচনে জামায়াত ও আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল গেলেও তিনি যাননি। এতে তাঁর নামের সাথে তকমা জুটে “আপসহীন নেত্রী”-র। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বিরোধী দলগুলোর ইচ্ছা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শাসন ব্যবস্থার প্রচলন, বিরোধী দলগুলোর দাবী অনুযায়ী ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা—সবই তাঁর একই সাথে সংগ্রামী ও ইনসাফবাদী মানসিকতার পরিচয়। ২০০৬ সালের পর এক এগারোর অবৈধ সরকারও তাদের কূট কৌশল সফলে ব্যর্থ হয় বেগম জিয়া নতিস্বীকার না করায়। ফ্যাসিবাদী শাসনের চাপেও দেশ ছাড়েননি, আপোস করেননি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার এই নিরবচ্ছিন্ন লড়াই খালেদা জিয়াকে ইতিহাসে একজন সংগ্রামী নেত্রী হিসেবে অমর করে রাখবে।
ক্ষমতায় থাকাকালে বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি বাংলাদেশের সামাজিক ও কাঠামোগত ভিত্তি শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৯১ সালে তাঁর নেতৃত্বে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়, যা গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এরপর প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি আমূল সংস্কার সাধন করেন। স্বৈরাচারদের ন্যায় চোখ ধাঁধানো বিশাল বিশাল মেগাপ্রজেক্ট না করে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী অবকাঠামো উন্নয়ন্ন করেছেন, মৌলিক সংস্কারে জোর দিয়েছেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে তিনি সকলের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন, শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য ও শিক্ষার বিনিময়ে অর্থ প্রকল্প চালু করেন, দুই শিফট ব্যবস্থার প্রচলন ঘটান, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালু করেন এবং উপবৃত্তি প্রদান শুরু করেন। অর্থনীতিতে ভ্যাট ব্যবস্থা প্রবর্তন, মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রসার, তৈরি পোশাক শিল্প ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে তাঁর নীতিগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখে। নারী ও শিশু সুরক্ষায় ২০০২ সালের এসিডবিরোধী আইন প্রণয়ন ছিল তাঁর শাসনামলের সবচেয়ে সাহসী ও মানবিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি, যা দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। তিনি জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাস ও মাফিয়া কালচার, দুর্নীতি রোধ করেন।
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে নারীদের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার জন্য সাহসী ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা, উপবৃত্তি ও ‘খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা’ কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি লক্ষ লক্ষ দরিদ্র মেয়েকে স্কুলমুখী করেন। নারী নিরাপত্তায় তাঁর সবচেয়ে ঐতিহাসিক অবদান ছিল ২০০২ সালের এসিডবিরোধী আইন, যা এসিড হামলার মতো ভয়াবহ অপরাধ প্রায় নির্মূল করে দেয়। ধর্ষণ, এসিড সন্ত্রাস ও যৌতুকবিরোধী আইন, নারী ও শিশু নির্যাতনের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, পুলিশ বাহিনীতে নারী নিয়োগ এবং নারী শিক্ষকের কোটা—সব মিলিয়ে তিনি নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নকে স্লোগানে নয়, আইনে ও বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়া আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সংগ্রাম, ত্যাগ ও রাষ্ট্রনায়কসুলভ সিদ্ধান্তগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে অমলিন হয়ে থাকবে। এক সাধারণ গৃহবধূ থেকে আপোসহীন নেত্রী হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত উত্থানের গল্প নয়—এটি গণতন্ত্র, নারীর ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা রক্ষার এক অনন্য অধ্যায়। সময়ের রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেবে, নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতা নয়—দায়িত্ব ও আত্মত্যাগ।
মুহাম্মাদ জাহিন,শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
