বিগত ২৮ ফেব্রুয়ারী ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন। নিহত হন ইরানের আরো অনেক রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিবর্গ। হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা হামলা চালায়। ইরানের এই হামলা শুধু ইসরায়েলের উপরই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এই হামলা পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর উপরও ছড়িয়ে পড়ে। ইতোমধ্য ইরান হরমুজ প্রণালীও বন্ধের পদক্ষেপ নিয়েছে।
দেখা যাচ্ছে, ইরান এই সামরিক যুদ্ধটাকে অর্থনৈতিক যুদ্ধের দিকে ধাবিত করছে, যেটা প্রাকারান্তরে খোদ যুক্তরাষ্ট্র ও গালফ উপসাগরের দেশসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিকেই আক্রান্ত করে তুলবে।
ইরান পারস্য উপসাগরের দেশগুলোর মার্কিন ঘাটিতে হামলা করছে। মূলত এর মাধ্যমে ইরান শুধু মার্কিন ঘাটিকেই আক্রান্ত করছে না, পরোক্ষভাবে আক্রান্ত করছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকেও।
যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে পারস্য উপসাগরের অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে বিভিন্ন উপায়ে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। এই সংযোগ শুধু তেল ও গ্যাসের উপর নির্ভরশীল নয়; বরং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আর্থিক বাজার, অস্ত্র বিক্রি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা—সবকিছুর মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। পারস্য উপসাগরীয় বা গালফ দেশগুলোর সাথে যুক্ররাষ্ট্রের অর্থনীতি কিভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেটা এখানে মোটাদাগে তুলে ধরা হলো।
- পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদক অঞ্চল। বিশেষ করে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যদিও বর্তমানে মার্কিনীরা নিজেও বড় তেল উৎপাদক, তবুও বৈশ্বিক বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য গালফ অঞ্চলের তেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাজারের তেলের দাম নির্ধারিত হয় মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে। গালফ রাষ্ট্রগুলো বিশ্বের মোট খনিজ তেলের রিজার্ভের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করে। যদি এই অঞ্চলে সরবরাহ বিঘ্নিত হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যা মার্কিন পরিবহন, উৎপাদন এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। এছাড়াও, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট তেল আমদানির মাত্র ১০%-এর কম মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলেও, মার্কিন কোম্পানিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল তেল ও গ্যাস অবকাঠামো পরিচালনায় ও বিনিয়োগে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
- পেট্রোডলার যুক্তরাষ্ট্র ও গালফ দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের মধ্যে একটি অলিখিত চুক্তির মাধ্যমে এই ব্যবস্থার সূচনা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আরব (এবং পরবর্তীতে ওপেক-ভুক্ত অন্যান্য দেশ) তাদের তেল কেবল মার্কিন ডলারে বিক্রি করবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র এই দেশগুলোকে সামরিক সুরক্ষা এবং অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করবে।
যেহেতু প্রতিটি দেশকে তেল কিনতে হয়, তাই তেলের দাম ডলারে নির্ধারিত হওয়ায় বিশ্বের সব দেশকে রিজার্ভে প্রচুর ডলার রাখতে হয়। এটি মার্কিন ডলারকে ‘বিশ্বের রিজার্ভ কারেন্সি’ হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে । মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তেল বিক্রি করে যে বিপুল পরিমাণ ডলার আয় করে, তারা তা আবার মার্কিন ব্যাংক, সরকারি বন্ড এবং রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করে। একে বলা হয় ‘পেট্রোডলার রিসাইক্লিং’। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখছে।
- বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে, মার্কিন ট্রেজারি বন্ড (US Treasury Bonds) এবং গালফ অঞ্চলের দেশগুলোর (বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার) মধ্যে সম্পর্কটি একটি গভীর ‘ঋণ ও নিরাপত্তা’ চক্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
গালফ দেশগুলো যখন বিশ্ববাজারে তেল বিক্রি করে, তখন তারা পেমেন্ট হিসেবে মার্কিন ডলার গ্রহণ করে। এই বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত ডলার তারা অলস ফেলে না রেখে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে মার্কিন সরকারের কাছে ফেরত পাঠায়। বিনিময়ে মার্কিন সরকার তাদের ট্রেজারি বন্ড বা ঋনপত্র দেয়। গালফ দেশগুলোর বিশাল আকারের সরকারি তহবিল রয়েছে (যেমন: সৌদি আরবের PIF বা আমিরাতের ADIA) । এই তহবিলগুলো সরাসরি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ থেকে নিলামের মাধ্যমে বা সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বন্ড ক্রয় করে। বর্তমানে গালফ দেশগুলোর কাছে প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের মার্কিন ট্রেজারি বন্ড রয়েছে।
মার্কিন সরকার তাদের বিশাল বাজেট ঘাটতি মেটাতে বিশ্ববাজার থেকে ঋণ নেয়। গালফ দেশগুলো এই ঋণের অন্যতম বড় যোগানদাতা। গালফ দেশগুলো যত বেশি বন্ড কিনবে, মার্কিন সরকারের জন্য ঋণের সুদ কম থাকবে, যা তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখে।
- পেট্রোডলার, ট্রেজারি বন্ড এবং অস্ত্র বাণিজ্য—এই তিনটি বিষয় একটি চক্রাকার সম্পর্ক। গালফ দেশের তেল বিক্রি করে করে পেট্রোডলার আয় হয়, সেই ডলার যুক্তরাষ্ট্রকে ঋণ দেওয়া(বণ্ড কেনা)হয় ,সেই ঋণের সুদ দিয়ে আবার আমেরিকা থেকেই অস্ত্র কেনা হয়। এই চক্রের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের ব্যবসা চাংগা রাখার পাশাপাশি ডলারের মানও বজায় রাখছে।
- মার্কিন জায়ান্টরা কাতার, সৌদি আরব এবং কুয়েতের তেল ও গ্যাস উত্তোলনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে রেখেছে , বিনিয়োগ করেছে প্রযুক্তি-এ আই ডেটা সেন্টার সহ, সামরিক বেসামরিক খাত সমূহে।
দেখা যাচ্ছে, গালফ অঞ্চলের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ডলার অর্থনীতির অন্যতম প্রাণ ভোমরা। ইরান- ইসরায়েলের এই যুদ্ধের ফলে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম ৫ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটি মার্কিন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৬ সালে যেখানে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার কমানোর কথা ছিল, যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায় তারা এখন ‘হোল্ড’ মোডে চলে গেছে। অর্থাৎ, মার্কিন নাগরিকদের জন্য ঋণ গ্রহণ এবং মর্টগেজ খরচ আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য চড়া থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারে চরম অস্থিরতা ও নিম্নমুখী প্রবণতা বিরাজ করছে। বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসএন্ডপি ৫০০ সূচক বর্তমানে এর ৫০-দিন ও ১০০-দিনের মুভিং অ্যাভারেজের নিচে অবস্থান করছে, যা বাজার বিশ্লেষকদের মতে একটি Bearish বা মন্দাভাবের ইঙ্গিত। ইসরায়েল বিশ্বের অন্যতম বড় চিপ ডিজাইন ও ম্যানুফ্যাকচারিং হাব। Intel (ইনটেল)-এর বড় কারখানা এবং এনভিডিয়া(Nvidia) ও অ্যাপল(Apple)-এর গুরুত্বপূর্ণ রিসার্চ সেন্টারগুলো ইসরায়েলে অবস্থিত। যুদ্ধের কারণে এই কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ায় বৈশ্বিক চিপ সরবরাহে টান পড়েছে, যার ফলে মার্কিন টেক জায়ান্টদের শেয়ারে পতন দেখা দিয়েছে। যুদ্ধকালীন অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগকারীরা টেক শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে সোনা বা বন্ডে টাকা সরিয়ে নিচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, গালফ দেশগুলো তাদের যুদ্ধের খরচ মেটাতে মার্কিন বাজার থেকে দ্রুত তাদের ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ তুলে নিতে পারে, যা মার্কিন শেয়ার বাজারে ধস নামাবে।
উল্লেখ্য, এই যুদ্ধের ফলে মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর শেয়ার বর্তমানে তুঙ্গে রয়েছে। এছাড়াও, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন কোম্পানিগুলোর শত বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো এখন সরাসরি ইরানি মিসাইল হামলার হুমকির মুখে । এর ফলে নতুন মার্কিন বিনিয়োগ পুরোপুরি থমকে গেছে।
এরিমধ্যে ইরান তার হরমুজ প্রণালী বন্ধ অবরোধ করেছে। এই অবরোধের সাথে সাথে এক অর্থে গোটা দুনিয়ার অর্থনীতির ভাগ্য এই যুদ্ধের সাথে জড়িয়ে গেছে। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের বা মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০-২১% এবং এলএনজির ২০% পরিবাহিত হয়। বাংলাদেশও তার জ্বালানি তেলের সিংহভাগ এবং এলএনজির প্রায় ৭২% কাতার ও ওমান থেকে এই পথেই আমদানি করে। সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় দেশে ইতিমধ্যেই জ্বালানি রেশনিং শুরু হয়েছে ।
খোদ মার্কিনীরাও এই হরমুজ প্রণালীর উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেই বড় উৎপাদক, তবুও তারা এই পথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪,০০,০০০ থেকে ৫,০০,০০০ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও ঘনীভূত জ্বালানি আমদানি করে । এছাড়া কাতার থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলএনজি এই পথেই পরিবাহিত হয়। মার্কিনীদের জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন (সার সংকট) ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পও (অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিক) এই প্রণালী বন্ধের ফলে বর্তমানে বড় ধরনের সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্যের (পচনশীল-অপচনশীল) ৮০% থেকে ৯০% বিদেশ থেকে আমদানি করে, প্রণালীটি বন্ধ হওয়ায় বর্তমানে এই দেশগুলোতে খাদ্যের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এবং দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এই অঞ্চলের মেগা প্রজেক্টগুলোর (যেমন সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’) জন্য প্রয়োজনীয় স্টিল, সিমেন্ট এবং ভারী যন্ত্রপাতি এই প্রণালী দিয়েই আসত, যা এখন স্থবির হয়ে পড়েছে। এছাড়াও, বিশ্বের মোট ইউরিয়া ও নাইট্রোজেন সারের একটি বড় অংশ (প্রায় ৩০%) কাতার এবং সৌদি আরব এই পথ দিয়ে রপ্তানি করে। বর্তমানে এই সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় বিশ্বজুড়ে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০০-এর বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ ওমান সাগরে আটকা পড়ে আছে, যা খাদ্যবাহী পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহারের কারণে পণ্য আমদানির খরচ ২০-৩০% বেড়ে গেছে, যা এই দেশগুলোতে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করছে।
হরমুজ প্রণালী কেবল তেলের পথ নয়, বরং এটি পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ‘খাদ্য ও পণ্য সরবরাহের ধমনী’। এটি বন্ধ হওয়া মানে এই দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বাজার ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়া।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, মার্কিন অর্থনীতির প্রতিটি রন্ধ্রে গালফ দেশগুলোর পুঁজি ও জ্বালানি মিশে আছে। যদি এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেতৃত্ব এবং ডলারের শ্রেষ্ঠত্ব হুমকির মুখে পড়বে। তাই নিজের অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ নিরাপত্তা বজায় রাখার স্বার্থেই মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা রক্ষা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো বিকল্প নয়, বরং একটি অপরিহার্য জাতীয় নিরাপত্তা লক্ষ্যমাত্রা। ফলে খুব দ্রুতই ট্রাম্প চাইবে এই যুদ্ধের সমাপ্তি হোক। এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হওয়া মানে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়া। কারণ ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের লড়াই নয়, এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভূমিকম্প।
শান্তনু বোস
