ছয় বছরের একটি শিশু—যার পৃথিবী এখনো রঙ পেন্সিল, গল্পের বই আর খেলাধুলাতে রঙিন থাকার কথা ছিল,তার উপর যদি চাপিয়ে দেওয়া হয় ‘ভর্তি যুদ্ধ’-এর চাপ, তাহলে আমরা আসলে কী করছি? আমরা কি তার মেধা যাচাই করছি, নাকি তার শৈশব কেড়ে নিচ্ছি? বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বারবার একই চক্রে ঘুরে ফিরে আসে—কখনো লটারি, কখনো ভর্তি পরীক্ষা। কিন্তু এই নীতিগত দোলাচলের মাঝে হারিয়ে যায় শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ, মানসিক সুস্থতা এবং শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য। এই বিতর্ক তাই কেবল একটি নীতিগত প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। ২০১১ তে পরীক্ষামূলক ভাবে শিক্ষার্থীদের ভর্তিযুদ্ধের মানসিক চাপ থেকে রেহায় দিতে প্রথম শ্রেণিতে বাধ্যতামূলক লটারি সিস্টেমের পরিচয় করা হয়।করোনার পর থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষা তুলে দিয়ে লটারি সিস্টেম চালু হয়।ক্ষমতায় আসার এক মাসের মাথায় বিএনপি সরকার পুনরায় উলটো পথে হাটছে;ফিরিয়ে আনছে প্রথম শ্রেণি থেকেই ভর্তি পরীক্ষা।
সম্প্রতি সংসদে হাসনাত আব্দুল্লাহর প্রস্তাবের পর শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন লটারি সিস্টেম তুলে দিয়ে ভর্তি পরীক্ষা পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত জানান।এটি নিয়ে গণমাধ্যম ও সোশাল মিডিয়ায় তুমুল বিতর্ক লক্ষ্য করা যাচ্ছে।নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে বলে স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ফেলছেন অনেক এলামনাই। অনেকেই মনে করছেন, এতে করে শিক্ষার মান বাড়বে এবং মেধার সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ছয় বছরের একটি শিশুর মেধা কি আদৌ এমন একটি পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ভুলভাবে যাচাই করা যায়?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন যথার্থই বলেছেন, “ভর্তি পরীক্ষা মানেই হলো কোচিং বাণিজ্য চলে আসবে। ভর্তি পরীক্ষা মানেই হলো শিশুর মেধার যাচাই করা। এতে ফেল করা মানেই শিশুকে ‘ট্যাগ’ দেওয়া যে সে পারে না। এভাবে শিশুকে ট্রমার মধ্যে দেওয়া উচিত না।” এই পর্যবেক্ষণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে ভর্তি পরীক্ষা কেবল একটি মূল্যায়ন পদ্ধতি নয়, এটি একটি সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করে—যেখানে সফলতা ও ব্যর্থতার একটি কঠোর মানদণ্ড শিশুর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। প্রথমত, এত অল্প বয়সে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার ফলে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব পড়ে। এই বয়সে তারা শেখার আনন্দে মগ্ন থাকার কথা, কিন্তু আমরা তাদের ঠেলে দিচ্ছি ভয়, চাপ এবং প্রতিযোগিতার এক নির্মম বাস্তবতায়। যখন কোনো শিশু ভর্তি পরীক্ষায় ‘চান্স’ পায় না, তখন তাকে অজান্তেই একটি ‘ফেইলিউর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি তাকে এই ট্যাগ থেকে মুক্তি দেয় না। ফলে শিশুর আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার মধ্যে জন্ম নেয় হীনমন্যতা এবং শেখার প্রতি অনাগ্রহ। একটি ছয় বছরের শিশুর জন্য এটি নিছক একটি পরীক্ষা নয়; এটি তার আত্মপরিচয় গঠনের ওপর একটি নেতিবাচক আঘাত। যেমন, আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা বিভাগীয় শহরের জিলা স্কুল গুলোতে ভর্তি যুদ্ধ নিয়ে কী অমানসিক, অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা।অভিভাবকেরা সন্তানদেরকে তাদের কাঙ্খিত বিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্য অনায়াসে একই শ্রেণিতে দুই এমনকি তিনবার রেখে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ান।বাংলাদেশের বাস্তবতায় শিশুদের নিজের কন্সেন্ট না নিয়ে অভিভাবকেরা তার ইয়ার লস করতে পারেন কিনা সে এক আইনী প্রশ্ন।তবে ভর্তি পরীক্ষা সিস্টেম যে এ সামাজিক সমস্যার উৎস,তাতে বোধ করি সন্দেহ নেই।
আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো—অনেক শিক্ষাবিদই মনে করেন, এই বয়সে শিশুদের মধ্যে মেধাগত পার্থক্য খুবই সামান্য। তাদের শেখার গতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সেটিকে নির্দিষ্ট প্রশ্নপত্র দিয়ে মাপা অবৈজ্ঞানিক। ফলে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ‘যোগ্য’ ও ‘অযোগ্য’ নির্ধারণ করার ধারণাটিই প্রশ্নবিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষাব্যবস্থাকে অস্বাস্থ্যকরভাবে কেন্দ্রীভূত করে তোলে। ভালো শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট কিছু নামকরা স্কুলে কেন্দ্রীভূত হয়, ফলে একটি শহরে হাতে গোনা কয়েকটি স্কুলই ‘ভালো’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। অন্য স্কুলগুলো ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে এবং সেগুলো থেকে মানসম্মত শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ কমে যায়।
এই কেন্দ্রীভবনের ফলে কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে আসে অতিরিক্ত ক্ষমতা। একটি সিটের জন্য যখন হাজারো প্রতিযোগী থাকে, তখন সেই সিটের মূল্য বেড়ে যায়—শুধু মেধার বিচারে নয়, অর্থের বিচারে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা লাখ লাখ টাকা খরচ করতেও প্রস্তুত থাকেন সন্তানের ভর্তির জন্য। ফলে শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার থেকে সরে গিয়ে হয়ে ওঠে এক ধরনের ‘প্রিমিয়াম পণ্য’, যা কিনতে পারে কেবল সামর্থ্যবানরা।
তৃতীয়ত, ভর্তি পরীক্ষা কোচিং বাণিজ্যের জন্য একটি উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে। পরীক্ষা মানেই প্রস্তুতি, আর সেই প্রস্তুতির বাজার দখল করে নেয় কোচিং সেন্টারগুলো। শিশুদের স্কুলের বাইরে অতিরিক্ত ক্লাসে ঠেলে দেওয়া হয়, যেখানে শেখার আনন্দের বদলে গুরুত্ব পায় কেবল নাম্বার পাওয়ার কৌশল ও শর্টকাট। এই প্রবণতা শিক্ষাকে একটি বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করে। শিক্ষার লক্ষ্য আর জ্ঞানার্জন বা ব্যক্তিত্ব বিকাশ নয়; বরং নির্দিষ্ট প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া। ফলে শিশুদের সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং অনুসন্ধিৎসা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
চতুর্থত, ভর্তি পরীক্ষা সমাজে স্পষ্ট শ্রেণি বৈষম্য তৈরি করে। ধনী পরিবারের সন্তানরা একাধিক কোচিং, প্রাইভেট টিউটর এবং উন্নত শিক্ষাসামগ্রী পায়, যা তাদের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখে। অন্যদিকে, দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য এই সুযোগগুলো প্রায় অনুপস্থিত।
এই বৈষম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সরকারি স্কুলগুলো মূলত দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের জন্য একটি ভরসার জায়গা হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, জেলা স্কুলের মতো ভালো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ভর্তি পরীক্ষার কারণে ধনী পরিবারের শিশুরাই বেশি সুযোগ পায়। তারা আর্থিক সুবিধার কারণে ভালো প্রস্তুতি নিয়ে ভর্তি যুদ্ধে এগিয়ে থাকে। ফলে যে স্কুলগুলো দরিদ্রদের জন্য আশ্রয় হওয়ার কথা, সেগুলোও ধীরে ধীরে ‘প্রতিযোগিতামূলক এলিট প্রতিষ্ঠানে’ পরিণত হয়। দরিদ্র শিশুরা শুরুতেই ভালো শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলস্বরূপ শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার না থেকে একধরনের বিলাসিতায় পরিণত হয়—যেখানে প্রবেশাধিকার নির্ধারিত হয় আর্থিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে। শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার নিয়েও তখন শুরু হয় বাণিজ্য এবং অসমতার এক নির্মম চক্র।
এই পরিস্থিতিতে সমাধান খোঁজার জন্য আমাদের মূল সমস্যার দিকে তাকাতে হবে। ভর্তি পরীক্ষা চালু করা বা বাতিল করা—এটি মূল সমস্যা নয়; এটি কেবল একটি উপসর্গ। প্রকৃত সমস্যা হলো আমাদের স্কুলগুলোর মধ্যে মানের বৈষম্য।
দেশের প্রতিটি স্কুলে মানসম্মত অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে, পর্যাপ্ত রিসোর্স দিতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে কারিকুলামকে শিশুবান্ধব ও যুগোপযোগী করে তুলতে হবে, যাতে প্রতিটি শিশু তার নিজস্ব গতিতে শিখতে পারে।
এই কাজগুলো কঠিন, সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। কিন্তু এই কঠিন পথ এড়িয়ে গিয়ে কোমলমতি শিশুদের ওপর ভর্তি পরীক্ষার চাপ চাপিয়ে দেওয়া একটি নিন্দনীয় শর্টকাট ছাড়া আর কিছুই নয়। অতএব, অহেতুক লটারি বনাম ভর্তি পরীক্ষার বিতর্কে আটকে না থেকে আমাদের সমস্যার শেকড়ে নজর দিতে হবে। আমরা যদি সত্যিই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা চাই, তাহলে আমাদের নীতিনির্ধারণেও সেই প্রতিফলন থাকতে হবে।
শিক্ষা কোনো যুদ্ধ নয়, এটি একটি যাত্রা—যেখানে প্রতিটি শিশুর সমানভাবে এগিয়ে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আমাদের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য।
ইসমাম জামান,ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
