তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের দেশ বা দক্ষিণ বিশ্বের দেশ বাংলাদেশে খাল খনন কি এখন জরুরি?
বাংলাদেশের হরমুজ কিংবা সুয়েজ না, অত্যন্ত ছোট ছোট খাল, যেগুলোর নামও সমাদৃত না, কেবল স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে স্থানীয় বিশেষত গ্রামীণ ভাষায় চর্চিত হয়। বিশ্বরাজনীতি কি এই ছোট ছোট খালগুলোকে দেখে?
জি, বিশ্বরাজনীতি এই খালগুলোকে দেখে। কিন্তু এগুলোকে এড়িয়ে যায়, নিজেদের স্বার্থে। কে চাহে ঘুমন্তকে জাগিয়ে তুলতে? ঘুমিয়ে থাকুক খাল, বাংলাদেশের মানুষ আর সরকার। কিন্তু যেভাবেই হোক, এ মুহূর্তে বাংলাদেশের সরকার এ ব্যাপারে ‘ঘুমেসে’ পড়েনি।
মুক্তিপত্রের যুগ্ম সম্পাদক অপরাজিতার যে প্রশ্ন, সে প্রশ্ন জাগে যেকোনো জেগে থাকা মানুষের মনে, বাংলাদেশের নাগরিকের মনে। চলুন একে একে কয়েকটা প্রশ্নের দিকে আগানো যাক।
কোনো অর্থনৈতিক লাভ কী আছে তারেক রহমান/সরকারের এই খাল খননে?
নিশ্চয় আছে। অর্থনৈতিক লাভ তো আসলে তৈরি করে নিতে হয়। ব্যবসায়িক জায়গা থেকে দেখলে একজন ব্যবসায়ীর চিন্তা করতে হয় কীভাবে মুনাফা তৈরি করে নেওয়া যাবে। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ এই মুনাফা বা লাভ তৈরির চিন্তা করছে কিনা।
নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এখন সরকার গঠন করেছে। এই দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল “নদী, খাল, জলাশয় খনন বা পুনরুদ্ধার”। বর্তমান কর্মসূচি সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চিহ্ন। এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু তারেক রহমান এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোসহ সরকার এই কর্মসূচি থেকে কী চায়? লাভ চায় কি?
হ্যাঁ, তারেক রহমান বলুন কিংবা এই সরকার অথবা অন্য রাজনৈতিক দল কোনোক্রমেই, বৈশ্বিক দিক থেকে চিন্তা করলে, নব্য উদারবাদী বা তুলতুলে অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে নয়। যা এই তৃতীয় বিশ্বের দেশ বা দক্ষিণ বিশ্বকে (ভাগ করবার জন্য নয়, অত্যাচারিতের সামষ্টিক পরিচয় নির্দিষ্ট করবার জন্য) কেবল ঋণী-নতজানু করে রাখতে চায়।
প্রশ্নে ফিরে যাই। সরকারের লাভ হলো জনসম্পৃক্ততা। বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সরকার জনমানুষের কাছে গেলো। এইটাই দরকার ছিল। যেই লাভ নব্য উদারবাদী চোখে ধরা পড়বার কথা না, এই লাভ সেই লাভ, সেই অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে ত্যারছা হয়ে আলোর মতো বের হয়ে গেছে। কিন্তু এই আলো সূর্যের নাকি চাঁদের নাকি নক্ষত্রের তা দেখার জন্য সময় গড়াতে হবে। জনমানুষের চোখ-কান খোলা রাখতে হবে।
বিরোধী রাজনৈতিক দল প্রশংসা করেছে। তারা এই কাজে মিললো। বিরোধী মানেই সব কাজে বিরোধীতা নয় নিশ্চয়, বিশেষত সংসদে বা ক্ষমতায় থেকে জনমানুষের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নের জন্য যেখানে দরকার সেইখানে বিরোধীতা।
এবার আসি দল হিসেবে “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের লাভ কোথায়” প্রসঙ্গে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এই কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের কাজ দেখাচ্ছে। এই উত্তর খুব সহজ। কিন্তু এই কাজ যে ইতিহাসকে একই সুতোয় ধরা, ধরে ধরে মালা গাঁথা সেই জায়গায় এই দলের অদৃশ্য লাভ নিহিত। কৃষি, সেচ, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করবার জন্য শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচি নিয়েছিলেন। এই প্রত্যেকটিকেই আলাদা করে ব্যাখ্যা করা যাবে। কিন্তু এর সবকটিই জড়িত অত্যন্ত বাস্তব কিছু সমস্যার সাথে। অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের সাথে মানুষের জীবনের বাকি ক্ষেত্রগুলো গভীরভাবে জড়িত এবং প্রভাবিত।
জিয়াউর রহমান দেখতে পেয়েছিলেন উক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে জনঅংশগ্রহণ সম্ভব। বুঝতে পেরেছিলেন জনঅংশগ্রহণ বর্তমান অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। “ঐচ্ছিক শ্রম”, “কাজের বিনিময়ে খাদ্য” এর মতো কর্মসূচিগুলোও এর আওতাধীন ছিল বা এখনো থাকতে পারে। এর মধ্য দিয়ে চিরায়ত গ্রামীণ সংস্কৃতি, শ্রমের মূল্য, শ্রমিকের সাথে রাজনীতিবিদ ও আমলা-মন্ত্রীদের দূরত্ব কমা এসব ঘটে থাকে।
তারেকের এই কর্মসূচিতেও দেখেছেন ৫৪ জেলায় নিশ্চয় সব কর্মকর্তা না গেলেও অনেকেই গেছেন, যাদের দেশ ও মানুষ নিয়ে ন্যূনতম ভাবনা আছে। এক ফসলি জমি থেকে তিন ফসলি জমিতে রূপদান, খাদ্যসংকট মোকাবেলা, এমনকি দেশ ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে রপ্তানি করা কিংবা ক্ষুধিত মানুষের জন্য আফ্রিকাসহ যেকোনো জায়গায় পাঠানো ফিলিস্তিনে খাবার পাঠানোর কথাও জাগিয়ে তোলে।
শেষ করার আগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি প্রশ্ন করা উচিত। তা হলো, বাংলাদেশে যে অনেক খাল ছিলো, এই খালগুলো ভরাট হলো কীভাবে? ভরাট না হলে তো এগুলো খননের প্রশ্ন আসতো না। প্রসঙ্গত মনে পড়ে, ২০২৩ সালে একটি আইনও হয়েছিল, “ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন”। এ ছাড়া “জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০” এবং “পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫”। এই সব আইনেই খালসহ জলাধার, নদী, ভূমি রক্ষার জন্য নানান বিধান রয়েছে, ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে এবং আইনের শাসনের মান হতাশাব্যঞ্জক হওয়ায় কোনো আইনই নেতাদের, কর্মীদের এবং তাদের সহযোগী ও সহযাত্রীদের থামাতে পারেনি। খাল এবং জলাশয় ভরাট করে নানান ভবন, স্থাপনা, প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে। ঝিল ভরাট করে শুরু করা হয়েছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ। এমনকি ৫ আগস্টের পরেও বালু উত্তোলন, পাথর উত্তোলনসহ নানান পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ আমরা দেখেছি অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রেও। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা, ক্ষমতার অপব্যবহার না করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপরেও নির্ভর করছে বর্তমান সময়ের খাল খনন কর্মসূচি কতটুক জনমানুষের, প্রাণ-প্রকৃতির কাজে লাগবে।
অতএব, আশা করা যায়, নতুন উদ্যমে খাল খনন প্রকল্প বিদ্যমান বৈষম্যমূলক, অত্যাচারী ও শোষণমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন সময়ের নতুন কাঠামোয় রূপান্তরিত রেখায় পা ফেলতে বাংলাদেশের সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশের জনমানুষের জন্য এক নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে।
সর্বোপরি, খাল কেটে কুমির না, খাল কেটে পানি নিয়ে আসা হোক।
মোঃ ঈদুল ফয়সাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী। পাশাপাশি বিভিন্ন আন্দোলন এবং শিল্পমাধ্যমের সাথে সম্পৃক্ত।
