জামায়াতে ইসলামী নেতারা সম্প্রতি যখন একাত্তর নিয়ে কথা বলতে যান, তখন কয়েকটা প্রবণতা পরিষ্কার। প্রথমত, তারা তাদের ভূমিকাকে ‘ভারত-বিরোধীতা’র মোড়কে হাজির করেন। তারা প্রথমেই বলেন যে, ভারত তাদের স্বার্থেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।
দুনিয়ার যে কোনো রাষ্ট্রই আরেক রাষ্ট্রের পক্ষে/বিপক্ষে দাঁড়াবে, সেটা তার স্বার্থেই। ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ, উদ্ভূত শরণার্থী সঙ্কট থেকে শুরু করে বহু কারণেই যে ভারত মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল এটা তো নতুন কোনো কথা নয়। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে দুনিয়ার বিখ্যাত গবেষকগণ সেটা দেখিয়েছেন। বাংলাদেশের বামপন্থীরা দীর্ঘদিন ধরে এসব নিয়ে কথা বলেছেন। মুক্তিযুদ্ধে ভারত তার স্বার্থ দেখেছে, এই মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে এই জনগোষ্ঠীর লড়াইয়ের ন্যায্যতা হারায় কিংবা কীভাবে পাকিস্তান সামরিক সরকারকে জেনোসাইডমূলক সহিংসতায় জামায়াতের দলীয় সহযোগীতার ন্যায্যতা পায়, সেটা ঈশ্বরই জানেন।
এখন ধরেন, দুনিয়ার যে কোনো গণ-আন্দোলনে, বহিরাগত শক্তি জড়িত হয়, সুপার পাওয়ার জড়িত হয়। তারা তাদের স্বার্থে আন্দোলনের হিসাব-নিকাশ করে। এটা তো আর খোদ আন্দোলনের ন্যায্যতার প্রশ্ন নয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান যখন হচ্ছে, বহু রাষ্ট্র কী নানাভাবে এতে তাদের স্বার্থ দেখে নাই? বা দেখবে না? এখন মার্কিনিরা বা ভারত তাদের স্বার্থ দেখেছে বলে, আওয়ামী লীগের সহিংসতা বা জামায়াতের সহিংস ভূমিকা কী জায়েজ হয়ে যায়?
চিন্তার দ্বন্দ্ব ছিল। এইখানে শুভঙ্করের ফাকি হচ্ছে, চিন্তার দ্বন্দ্ব বইলা তারা তো তাদের অপরাধকে আড়াল কইরা ফেলতে চান। জেনোসাইড ও যুদ্ধাপরাধের সহযোগীতা তো অপরাধ। এটাকে চিন্তার দ্বন্দ্ব দিয়া মোলায়েম বানায়ে লাভ নেই।
দ্বিতীয় যে প্রবণতা জামায়াতের আমির ৫ আগস্টের পর শুরু করছেন, তিনি একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকাকে চিন্তার দ্বন্দ্ব আকারে তুলে ধরছেন। এবং মোলায়েম সুরে বলছেন যে, তাদের ভিন্ন চিন্তা ছিল। সেই চিন্তা একাত্তরে পরাজিত হয়েছে, এরপর তারা বাংলাদেশকে মেনে নিয়েছেন মনেপ্রাণে। ঠিক, চিন্তার দ্বন্দ্ব ছিল। এইখানে শুভঙ্করের ফাকি হচ্ছে, চিন্তার দ্বন্দ্ব বইলা তারা তো তাদের অপরাধকে আড়াল কইরা ফেলতে চান। জেনোসাইড ও যুদ্ধাপরাধের সহযোগীতা তো অপরাধ। এটাকে চিন্তার দ্বন্দ্ব দিয়া মোলায়েম বানায়ে লাভ নেই।
আওয়ামীলীগ জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে রাজনীতি করেছে, তাই বলে জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা সহী হয়ে যায়নি।
এইবার একটা উদাহরণ দেই। কয়দিন আগে লিখেছিলাম। এই যে জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকাকে জাস্টিফাই করার জন্য বলে, ভারতের আধিপত্যের ভয়েই তারা তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পক্ষে বা অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, এই ন্যারেটিভকে একাই ধ্বসিয়ে দেন সিরাজ শিকদার।
সিরাজ শিকদার ১৯৬৮ সালে যে থিসিস দিয়েছিলেন, সেখানে পূর্ব বাংলার জনসাধারনের ‘দ্বন্দ্ব’ কাদের সাথে তার বিশ্লেষণ করেছিলেন। তার মতে, চারটি দ্বন্দ্ব ছিল : পাকিস্তানি উপনিবেশবাদের সাথে ‘জাতীয় দ্বন্দ্ব’; কৃষকের সাথে সামন্তবাদের দ্বন্দ্ব; জনগণের সাথে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের দ্বন্দ্ব; এবং বুর্জোয়া শ্রেণির সাথে শ্রমিক শ্রেণির দ্বন্দ্ব’।
এগুলো বিশ্লেষণ করে তৎকালের জন্য ‘প্রধান দ্বন্দ্ব’ হিসাবে পাকিস্তানি উপনিবেশবাদের সাথে দ্বন্দ্বকেই চিহ্নিত করা হয়েছিল : ‘কাজেই বর্তমান সামাজিক বিকাশের প্রক্রিয়ায় পূর্ব বাংলার জনগণের সাথে পাকিস্তানী উপনিবেশবাদের জাতীয় দ্বন্দ্ব প্রধান দ্বন্দ্ব।’
সিরাজের থিসিসই প্রমাণ করে মুক্তিযুদ্ধের বহু আগে থেকেই তারা ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে হুশিয়ার ছিলেন। এই ‘শঙ্কা’ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর জুলুমের পক্ষে থাকার কোনো ‘অজুহাত’ হয়ে উঠেনি তার জন্য। সামরিক বাহিনী এই জনগোষ্ঠীর ওপর যখন জেনোসাইড চালিয়েছে, তাকে ‘ভারতের আধিপত্যবাদ’ এর ‘ভয়ে’ সেই জেনোসাইডের পক্ষে দাড়াতে হয়নি।
তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও লড়েছিলেন, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেও লড়েছিলেন। মার্কিন ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছিলেন। এটাও উল্লেখ করা দরকার, মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগের লোকেরা সিরাজ শিকদারের লোকদের হত্যা করেছে বলে অভিযোগ আনা হয়েছিল।
এইজন্য আবারো বলি, বাংলাদেশের মুক্তি আসলে আওয়ামী-জামায়াতের বয়ানের বাইরে।
সহুল আহমদ একজন গবেষক, অ্যাক্টিভিস্ট ও লেখক
Leave A Reply