একাত্তর ও চব্বিশ সমান – এটি মূলত তারা বলেন, যারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেনি; উল্টো একাত্তরে হত্যাযজ্ঞে সহযোগিতা করেছেন। – মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
‘যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, এর চেতনার ফেরি করে বেড়াচ্ছেন, তাদেরকে বলবো, আপনারা কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থে, ক্ষমতার স্বার্থে দিল্লির কাছে দেশ বিক্রির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। সেদিন বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি।… একাত্তরে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি, চব্বিশেই দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ – মিয়া গোলাম পরওয়ার, সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
একাত্তর ও চব্বিশ আলাদা কিছু নয়। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই একাত্তরের স্পিরিট পুনর্জ্জীবিত হয়েছে। … একাত্তরে যে সাম্যের কথা বলা হয়েছিলো, চব্বিশে সেই বৈষম্যহীন সমাজের কথাই আমরা বলছি। ফলে যারা এটিকে পরস্পরবিরোধী বা মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য অসৎ…। ‘২৪-এর গণঅভ্যুত্থান, ‘৭১-এর সংগ্রাম, ‘৪৭-এর আজাদীর লড়াই– এই সবকিছুর ভেতর দিয়ে যে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র পেতে চেয়েছিলাম, তার একটি সুযোগ ও সম্ভাবনা গণঅভ্যুত্থানের পরে তৈরি হয়েছে। – নাহিদ ইসলাম, আহ্বায়ক, জাতীয় নাগরিক পার্টি
আজকাল কেউ কেউ বলছে, ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ’৪৭ এবং ’৭১ উভয়কেই ধারণ করে। তারা হয় রাজনৈতিকভাবে অজ্ঞ কিংবা তাদের দুরভিসন্ধি আছে। কারণ, ’৪৭ আর ’৭১ পরস্পরবিরোধী হওয়ায় এ দুটো একসঙ্গে ধারণ করা সম্ভব নয়।– মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি বলছেন, একাত্তরের স্বাধীনতা প্রকৃত স্বাধীনতা নয়। পাঁচ আগস্টের পর জামায়াতে ইসলামী যে একাত্তরের গুরুত্ব এবং সেখানে তাদের অপরাধমূলক ভূমিকাকে অস্বীকার করার যে প্রবণতা দেখিয়ে চলছে, এটা তারই অংশ। জামায়াতে ইসলামী এখনো বাংলাদেশের অস্বীকার বা ডিনাইয়ালিজমের রাজনীতিই করতে চায়। বাংলাদেশের ইতিহাস শিক্ষা দিচ্ছে যে, জেনোসাইড/গণহত্যা বা এই ধরনের ব্যাপক আকারে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে অস্বীকারের প্রবণতা সামাজিক পরিসর ও রাজনৈতিক পরিসরে অস্থিতিশীলতা ও ক্ষেত্রভেদে সহিংসতার প্রেক্ষাপট তৈরি করে। জামায়াতে ইসলামী যখনই একাত্তরকে অস্বীকার করেছে বা তাদের ভূমিকাকে অস্বীকার করেছে, তার তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের ভেতরে। এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার রেশ আওয়ামীলীগের হাত ধরে পৌঁছে গিয়েছিল একেবারে তেরোর শাহবাগ অব্দি। ডিনায়েলের যে সামাজিক প্রভাব তার থেকে কোনো শিক্ষাই জামায়াতে ইসলামী এখনো নিতে পারেনি।
একাত্তর নিয়ে বিএনপির যে অবস্থান – মির্জা ফখরুলের বক্তব্যে বা অন্যান্য নেতাদের বক্তব্যে দিয়ে ফুটে উঠছে – সেটা সর্বদাই তাদের অবস্থান ছিল। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রচুর কাজও করেছিল, যেমন স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র প্রকল্প গ্রহণ, জামুকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। ফলে, আজকে তাদের যে অবস্থান, তা শুনতে যতই আমার/আপনার কাছে আওয়ামী বয়ানের মতো শোনাচ্ছে, সেটাই আসলে মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে তাদের অবস্থান। বিএনপি গঠিত হয়েছিল একেবারে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে। একাত্তরের জেনোসাইড ও রণাঙ্গনের অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে রয়েছে। নতুনরা যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়া র্যাডিকেল শিফট ঘটাতে চান, বা মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ক্রিটিক্যাল অবস্থান তৈরি করতে চান, সেটা একাত্তরের প্রজন্মের দ্বারা প্রায় অসম্ভব। এই দ্বন্দ্ব আদতে প্রজন্মগত দ্বন্দ্ব। মোটাদাগে একাত্তরের প্রজন্ম দ্বারা চালিত সকল রাজনৈতিক দলগুলো মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে প্রায় একই ধরনের অবস্থান যে নিবে, তা খুব সহজেই অনুমেয়। তাদের মধ্যে গেঞ্জাম পাঁকে আসলে কার অবদান কতটুকু, কোন নেতা বেশি বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন, কে কতটুকু দলীয় ইতিহাস তৈরি করছেন, তা নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক পূর্বানুমান ও ভিত্তিগুলো নিয়ে তাদের কারোর মধ্যেই কোনো আপত্তি নেই। থাকবার কথাও নয়।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়া সিপিবির অবস্থানও মোটাদাগে সমান। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই দলসমূহের অবস্থান দেখে আপনার মনে হতে পারে, তারা আওয়ামীলীগের রাজনীতি করতেছে, কিন্তু এই ধরনের বিবেচনাবোধ অনৈতিহাসিক। মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে তাদের সবার অবস্থান এক, কিন্তু তাদের রাজনীতি ও বয়ানে কিছুটা তারতম্য রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এটা তারা প্রায় সবাই স্বীকার করেন, কিন্তু জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতি করবে কিনা, করলে সেটা কীভাবে, তা নিয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। মুজিব, জিয়া, ভাসানী – কারে কতটুকু গুরুত্ব দিবো তা নিয়ে হামেশা তর্ক চলতে থাকলেও, মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে তারা সবাই একই অবস্থান নিবেন এবং নেনও বটে। আওয়ামীলীগের আমলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উৎকট দলীয় উদযাপন, এবং এই ইস্যুতে তাদের গলার সুর ও স্বর এতো উচুতে ছিল যে, অন্যান্য দলের সমান অবস্থানগুলো আমার/আপনার কাছে কমজোর লেগেছে। এখন আওয়ামীলীগ নেই, ফলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়া মেইনস্ট্রিম সুরটা তাদেরই। এটাকে কেবল আওয়ামীলীগের রাজনীতির অবশেষ হিসাবে দেখাটা উচিৎ হবে না।
আবার খেয়াল করে দেখেন, আজকে সিপিবি বলছেন, ’৪৭ আর ’৭১ পরস্পরবিরোধী হওয়ায় এ দুটো একসঙ্গে ধারণ করা সম্ভব নয়। এটা কিন্তু আমাদের ইতিহাসের মেইনস্ট্রিম ভাবনা। এটা দেখানো সম্ভবও সাতচল্লিশ ও একাত্তরকে পরষ্পরবিরোধী হিসাবে দেখাটা আসলে কলকাতার দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের এখানে অজস্র নজির আছে, যেগুলো দিয়ে দেখানো সম্ভব, সাতচল্লিশ ও একাত্তর আদতে পরষ্পরবিরোধী নয়, বরঞ্চ এই জনগোষ্ঠীর তৎপরতা ও সক্রিয়তার ধারাবাহিকতা। আবুল মনসুর আহমদ, আবদুর রাজ্জাক, কামরুদ্দিন আহমদ সহ অনেকের লিটারেচার দিয়েই এটা প্রমাণ করা সম্ভব। কিন্তু, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম যে এতো আত্মবিশ্বাসের সাথে এটা বলতে পারলেন, কারণ এই বয়ানটাই মেইনস্ট্রিম, প্রায় আশির দশক থেকেই।
এই সমীকরণ বিএনপিকে একমাত্র দল বানিয়ে দেয়, যারা মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ইতিবাচক ভূমিকা পালনকারী দল। তারা দুটোকে স্বীকার করে। ৭১-প্রশ্নে তাদের অবস্থান প্রায় লীগ ও সিপিবি কাছাকাছি, মানে মৌলিক প্রশ্নে। কিন্তু ২৪-প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান লীগ ও সিপিবি থেকে অনেক দূরে। কিন্তু, বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে আরও নতুন সন্ধিক্ষণে। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী হিসাবে ৪৭, ৭১, ২৪ – এগুলোকে সমান না করে ধারাবাহিক সক্রিয়তা আকারে দেখার তারুণ্য দরকার। এইখানে ইন্টারভেনশন ঘটাতে চাচ্ছে এনসিপি।
অন্যদিকে, এনসিপির নাহিদ আজকে বলছেন, সাতচল্লিশকেও নিতে চান, একাত্তরকেও নিতে চান এবং চব্বিশকেও নিতে চান। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী হিসাবে তিনটাকেই নিতে পারাটা খুব জরুরি। অর্থাৎ, তিনটা ইভেন্টকে পরষ্পরবিরোধী হিসাবে না দেখে ধারাবাহিকতা আকারে দেখা যেতে পারে। কিন্তু নাহিদ তার ফেসবুকে পোস্টার পোস্ট করেন, তখন সাতচল্লিশ-এ নেতাদের ছবি ব্যবহার করেন, চব্বিশে পরিচিত শহীদদের ছবি ব্যবহার করেন, কিন্তু একাত্তরের কোনো পরিচিত কারো ছবি ইউজ করেন না। কারণ অনুমান করা যায় : একাত্তরে যারা/যিনি মূলনায়ক ছিলেন, তার দলই পরবর্তীতে স্বৈরশাসন কায়েম করে, এবং চব্বিশের সহিংসতার জন্য দায়ী। ফলে, স্বাভাবিক অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এতে আবার ঐতিহাসিক বিভ্রাট ঘটতেছে। একাত্তরের চরিত্ররা বিমূর্ত হয়ে উঠছে। বর্তমানই ইতিহাস – এর একটা নজির হতে পারে এই ঘটনা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন দিনগুলোতে ‘ইতিহাস’ আরও বিবাদমান ইস্যুতে পরিণত হতে যাচ্ছে।
এই পুরো যাত্রাপথে দেখা যায়, আওয়ামীলীগ আর জামায়াতে ইসলামী দুজনের কাছে ৭১ এর ২৪ বিপরীতমুখী। লীগের কাছে ৭১ ভালো, ২৪ খারাপ; জামায়াতের কাছে ২৪ ভালো, ৭১ খারাপ। অন্যদিকে, সিপিবির কাছে ৪৭ খারাপ, ৭১ ভালো; ২৪ নিয়ে তারা সন্দিহান। আবার, লীগের মূল নেতারা ৪৭-এর ক্রীড়নক ছিলেন, ৭১ এর ঘটনাপ্রবাহের নেতৃত্বে ছিলেন, কিন্তু লীগের পরবর্তী মতাদর্শ ৪৭-কে অস্বীকার করে কলকাতার ন্যারেটিভই গ্রহণ করেছে। জামায়াতের নেতা মওদুদী সাহেব ৪৭-এ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ছিলেন, আবার ৭১-এ কেবল বাংলাদেশের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেননি, রীতিমতো গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের মতো অপরাধের সাথে দল হিসাবে জড়িত ছিলেন। কিন্তু তারা পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে দাঁড়িয়ে ৭১-এ এই জনগোষ্ঠির সংগ্রামের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিলেন।
বিএনপির জন্ম হচ্ছে একাত্তরের আরও অনেক পরে, দলের জন্মলগ্নের অধিকাংশই রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা, তাদের কাছে ৭১ ও ২৪ উভয়ই ভালো; এবং একাত্তরকে সর্বাগ্রে রাখেন। ৪৭ নিয়ে তাদের অবস্থান খুব একটা স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে জন্ম হওয়াতে ৪৭ প্রশ্ন ডিল করার জরুরত পড়েনি হয়তোবা।
এই সমীকরণ বিএনপিকে একমাত্র দল বানিয়ে দেয়, যারা মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ইতিবাচক ভূমিকা পালনকারী দল। তারা দুটোকে স্বীকার করে। ৭১–প্রশ্নে তাদের অবস্থান প্রায় লীগ ও সিপিবি কাছাকাছি, মানে মৌলিক প্রশ্নে। কিন্তু ২৪–প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান লীগ ও সিপিবি থেকে অনেক দূরে। কিন্তু, বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে আরও নতুন সন্ধিক্ষণে। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী হিসাবে ৪৭, ৭১, ২৪ – এগুলোকে সমান না করে ধারাবাহিক সক্রিয়তা আকারে দেখার তারুণ্য দরকার। এইখানে ইন্টারভেনশন ঘটাতে চাচ্ছে এনসিপি। এনসিপির সবাই তরুণ, তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে ২৪ এর; ৪৭ ও ৭১ নিয়ে ক্রিটিক্যাল অবস্থান সহকারেও তারা এটাকে নিজেদের বলে স্বীকার করেন। কোনো ধরনের হীন্যমন্যতা নেই তাদের। কিন্তু চব্বিশের সহিংসতায় লীগের ভূমিকা একাত্তরে মুজিব বা লীগের নেতাদের ভূমিকা নিয়া তাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে।
ফলে, ‘ইতিহাস’ নিয়া নতুন ধরনের বয়ান ও বোঝাপড়া তৈরির দ্বারপ্রান্তে আমরা। ডিসিপ্লিন হিসাবে ইতিহাসশাস্ত্র এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বা রাখা উচিৎ বলেই মনে করি।
সহুল আহমদ একজন গবেষক, অ্যাক্টিভিস্ট ও লেখক
Leave A Reply