বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারি করা ‘জুলাই আদেশ’ (জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫) সরাসরি সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের আওতার বাইরে যাওয়ার কারণে এক নতুন সংকট উদ্ভূত হয়েছে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে আইনসভার অধিবেশনকাল ব্যতীত অন্য কোনো সময়ে আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অধ্যাদেশ (Ordinance) প্রণয়ন ও জারির ক্ষমতা দেয় । এই প্রক্রিয়ায় প্রদানকৃত অধ্যাদেশ সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হয়। তবে, এই ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক আইনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
৯৩(১) দফার শর্তানুসারে, রাষ্ট্রপতি এমন কোনো অধ্যাদেশ জারি করতে পারবেন না, যা “এই সংবিধানের কোনো বিধান পরিবর্তিত বা রহিত করিয়া যায়” । জুলাই আদেশটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক সংস্কার সাধন করতে চায়, যার মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন । এসব বিধান সাংবিধানিক সংস্কারের (অনুচ্ছেদ ১৪২) বিষয়বস্তু, যা ৯৩ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে জারি করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। সংবিধানের এই কঠোর সীমাবদ্ধতাই অন্তর্বর্তী সরকারকে একটি সংবিধান-অতিরিক্ত পথ বেছে নিতে বাধ্য করে। আদেশটিতে স্পষ্টত এর কর্তৃত্ব হিসেবে অনুচ্ছেদ ৯৩ উল্লেখ না করে তার পরিবর্তে ‘জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে’ জারি হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়েছে ।
এটি নির্দেশ করে যে অন্তর্বর্তী সরকার আইনি ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেয়ে সাংবিধানিক পুনর্গঠনের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
জুলাই আদেশ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে এর কর্তৃত্বের ভিত্তি হলো “২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে সংঘটিত ছাত্র–জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়” এবং “অন্তর্বর্তী সরকারের পরামর্শ” । এই আদেশের মূল উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রীয় সংস্কার সাধন, সুশাসন, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, এবং অতীতে অভিজ্ঞতা হওয়া কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ করা । আদেশটি মূলত ‘জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫’ কে আইনি রূপ দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া, যা ছয়টি সংস্কার কমিশন এবং একটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে প্রণীত হয়েছে। এই কমিশনগুলো সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, এবং জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের সুপারিশ করে । এই পদক্ষেপটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি নতুন আইনি ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।
সামরিক শাসকরা সাধারণত তাদের ক্ষমতাকে বৈধতা দিতে ডক্ট্রিন অফ নেসেসিটি (Doctrine of necessity) ব্যবহার করতেন, কিন্তু জুলাই আদেশে জনগণের সার্বভৌমত্বকে আইনের উৎস হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে, অন্তর্বর্তী সরকার সচেতনভাবে অতীতের সামরিক শাসনের দুর্বল আইনি পরিণতি (যেমন পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল হওয়া) এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
সাংবিধানিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ধরনের অতিরিক্ত-সাংবিধানিক পদক্ষেপের বৈধতা বিশ্লেষণের জন্য হ্যান্স কেলসেনের ‘পিওর থিওরি অফ ল’ এবং ‘গ্রুন্ডনর্ম’ (Grundnorm) তত্ত্ব অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক । কেলসেনের মতে, প্রতিটি আইনি ব্যবস্থার ভিত্তি হলো একটি মৌলিক মানদণ্ড বা গ্রুন্ডনর্ম, যা অন্যান্য সকল আইনি নিয়মের বৈধতা প্রদান করে। যখন একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো বিপ্লবী বা অ-সাংবিধানিক উপায়ে সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয় এবং নতুন ব্যবস্থা কার্যকরভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তখন পুরানো গ্রুন্ডনর্ম বিলীন হয়ে যায় এবং নতুন একটি গ্রুন্ডনর্ম প্রতিষ্ঠিত হয় ।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান প্রধানমন্ত্রী ও সংসদের পতন ঘটিয়ে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, তা প্রচলিত আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে স্থগিত করেছে এবং একটি নতুন গ্রুন্ডনর্ম প্রতিষ্ঠার ভিত্তি দিয়েছে । জুলাই আদেশ এই নতুন গ্রুন্ডনর্মকেই “জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা” হিসেবে ঘোষণা করে । এই বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দেয় যে অন্তর্বর্তী সরকার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা (Constitutional Continuity) বজায় রাখতে ব্যর্থ হলেও, তারা নতুন আইনি ব্যবস্থার কার্যকরতা (Effectiveness) এবং বিপ্লবী বৈধতাকে তাদের ক্ষমতার উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট । কার্ল স্মিটের ‘স্টেট অফ এক্সেপশন’ তত্ত্বও একই ধারণা সমর্থন করে, যেখানে বিপ্লবের মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ছাত্র-জনতার শক্তি সাময়িকভাবে সার্বভৌম হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং নতুন আইনি বাস্তবতা নির্ধারণ করে ।
জুলাই আদেশে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশ্যে গণভোটকে অপরিহার্য করা হয়েছে । এর ফলে বিপ্লবী বৈধতাকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত আইনি বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করবে । অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা করেছেন যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে । গণভোটের ব্যালটে প্রশ্ন থাকবে, “আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং ইহার তফসিল-১-এ সন্নিবেশিত সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত খসড়া বিলের প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?” । যদি গণভোটের ইতিবাচক ফল আসে, তবে নির্বাচিত সংসদ একটি বিশেষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, আগামী নির্বাচিত সংসদ তার নিয়মিত কাজের পাশাপাশি প্রথম ২৭০ দিনের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও কাজ করবে ।
জুলাই আদেশের ক্ষেত্রে আইনি চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২ এর অধীনে বিচারিক পর্যালোচনার (Judicial Review) ব্যাপক ক্ষমতা রাখে । এই ক্ষমতাবলে, আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়া গৃহীত যে কোনো পদক্ষেপ আদালত কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত হতে পারে। যেহেতু জুলাই আদেশ স্পষ্টতই ৯৩ অনুচ্ছেদের বাইরে গিয়ে জারি করা হয়েছে, তাই এটি ভবিষ্যতে বিচারিক পর্যালোচনার সম্মুখীন হতে পারে। সাংবিধানিক আইন অনুযায়ী, একটি নির্বাহী বা অতিরিক্ত-সাংবিধানিক আদেশ স্ব-ঘোষিতভাবে বিচারিক পর্যালোচনার আওতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না। যদি কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ বা রাজনৈতিক দল (যেমন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ) এই আদেশের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে, তবে বিচার বিভাগকে দুটি কঠিন পথের মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে: হয় বিপ্লবী কার্যকারিতাকে স্বীকৃতি দেওয়া (কেলসেনীয় নীতি), অথবা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং মৌলিক কাঠামোকে রক্ষা করা।
জুলাই আদেশের সাংবিধানিক বৈধতার সমস্যাটি শুধুমাত্র আইনি নয়, এটি মূলত একটি রাজনৈতিক সমস্যা, যার সমাধান সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং জনগণের সমর্থনের মাধ্যমে করতে হবে। জুলাই আদেশ প্রচলিত সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩-এর অধীনে জারি করা হয়নি এবং এটি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সংবিধানের স্বাভাবিক নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে সৃষ্ট কোনো আদেশও নয়। বিপ্লবী কর্তৃত্বের মাধ্যমে এই আদেশ জারি করা সাংবিধানিকভাবে বৈধ নয়, যদি আইনি ধারাবাহিকতার কঠোর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয় (অনুচ্ছেদ ৭)। তবে, কেলসেনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, এই আদেশ একটি সফল বিপ্লবের ফলস্বরূপ নতুন ‘গ্রুন্ডনর্ম’ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি দিচ্ছে ।
সব মিলিয়ে, রাষ্ট্রপতির “জুলাই আদেশ” বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে দাঁড়িয়ে একটি বৈধ পথ খুঁজে পায় না; বরং এটি সেই কাঠামোর সীমানা ভেঙে এক নতুন আইনি বাস্তবতা নির্মাণের প্রচেষ্টা। অনুচ্ছেদ ৯৩–এর সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে আদেশটি নিজেকে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে ঘোষণা করায় স্পষ্ট যে এটি প্রচলিত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার পথ নয়, বরং বিপ্লবোত্তর পুনর্গঠনের পথ বেছে নিয়েছে। কেলসেনীয় ‘গ্রুন্ডনর্ম’ তত্ত্ব ও স্মিটের ‘স্টেট অফ এক্সেপশন’ ব্যাখ্যা করে কেন এবং কিভাবে একটি সফল গণঅভ্যুত্থান পুরনো আইনি শৃঙ্খলাকে অকার্যকর করে নতুন নৈতিক–রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে আইনের উৎস হিসেবে তুলে ধরতে পারে। তবে এই বিপ্লবী কার্যকারিতা চূড়ান্ত বৈধতা পেতে গেলে জনগণের স্পষ্ট অনুমোদন অপরিহার্য—যা জুলাই আদেশ গণভোটের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে চায়। ভবিষ্যতে আদালত এই আদেশকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে—সংবিধানিক ধারাবাহিকতার কড়া মানদণ্ডে, নাকি বিপ্লবী বাস্তবতার কার্যকারিতার আলোকে—তা দেশের সাংবিধানিক রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে। শেষ পর্যন্ত, জুলাই আদেশের বৈধতা একটি কেবল আইনি প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কতটা ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করতে পারে, তার উপরই নির্ভর করবে।
অপরাজিতা দেবনাথ, এডভোকেট, ঢাকা জজ কোর্ট
