” দ্বিতীয় বিয়ে করতে স্ত্রীর অনুমতি লাগবেনা “
– এই শিরোনামে নিউজফিড ভরে আছে। অনেক পুরুষকে দেখলাম মহা খুশি। তাদের লেখা দেখে মনে হচ্ছে শুধুমাত্র এই রায়ের জন্যই তাদের ২য় বিয়েটা আটকে ছিল। এবার আর কোন বাধা রইল না। কেউ কেউ তো স্ত্রীকে ট্যাগ করেও পোস্ট দিচ্ছেন ফেইসবুকে।
অপরদিকে নারীরা আবার খুব রেগে আছে। কেন তাদের থেকে এই অনুমতি দেয়ার অধিকার কেড়ে নেয়া হলো। অনেক নারী অধিকার কর্মীরাও এই ব্যাপারে ক্ষোভ ঝাড়লেন। আবার পুরুষদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন নারী সমাজে নাকি আতংক বিরাজ করছে।
আসলেই কি তাই?
এবারে একটু আইনের দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করি। আজকের রায়ের ফলে কারা উপকৃত হলো? পুরুষ কি এখন চাইলেই স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বিয়ে করতে পারবে? হাইকোর্ট রায় দিয়েছে বলে যে শোরগোল পড়েছে বস্তত হাইকোর্ট নতুন কোন রায় দেয়নি।মুসলিম পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে পূর্বেও স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিলনা। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ে করার পূর্বে সালিশী পরিষদের অনুমতি গ্রহন বাধ্যতামূলক ছিল অন্যথায় তা শাস্তিযোগ্য ছিল। অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সালিশী পরিষদ বিবেচনা করতো যে স্ত্রীর সম্মতি আছে কিনা? বা দ্বিতীয় বিয়ে করার বৈধ কারন আছে কিনা ইত্যাদি। সালিশী পরিষদে স্ত্রী তার মনোনীত প্রতিনিধি পাঠাতো। কিন্তু স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া একমাত্র বিবেচ্য বিষয় ছিলনা।
১৯৬১ সালের এই অধ্যাদেশে দ্বিতীয় বিয়ের পূর্বে স্ত্রীর সম্মতি বাধ্যতামূলক না করে সালিশী পরিষদের অনুমতির যে বিধান আছে ২০২২ সালে সেটি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রীট দায়ের করেন আইনজীবী ইশরাত হোসেন। গতবছর সেই রীট মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশেকে বৈধ ঘোষণা করে যার ফলে ১ম স্ত্রী নয়, সালিশী পরিষদ হতেই অনুমতি গ্রহন করতে হবে এই বিধান বলবৎ থাকে। গতকাল সেই রীটের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে কিন্তু সংবাদপত্রগুলো ২য় বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অনুমতি লাগবেনা এমন শিরোনাম দিয়ে সমাজে ভুলবার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। বস্তত শিরোনাম হবে “২য় বিয়ের পূর্বে সালিশী পরিষদের অনুমতিবিহীন বিয়ে শাস্তিযোগ্য বিধান হাইকোর্টে বহাল” অথবা “মুসলিম পারিবারিক আইন চ্যালেঞ্জ করে করা রিট হাইকোর্টে খারিজ, সালিশী পরিষদের অনুমতি ছাড়া ২য় বিয়ে নয়”। কিন্ত ভুল শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে শত শত পুরুষের মনে নতুন করে যে লাড্ডু সাংবাদিক ভাইয়েরা ফাটালেন এতে কেবল সমাজে বিশৃঙ্খলা এবং পারিবারিক অশান্তিই তৈরী হবে।
বস্তুত বাংলাদেশে মুসলিম পুরুষের ২য় বিয়ের পথ কখনোই একদম সহজ ছিল না। সালিশী পরিষদের কাছে যথাযথ কারণ ব্যাখ্যা করেই তাকে অনুমতি নিতে হতো এবং সাধারণত ১ম স্ত্রীর সম্মতি ব্যাতীত সালিশী পরিষদ ২য় বিয়ের অনুমতি দিত না। তাই বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলিম পুরুষ একাধিক বিয়ে গোপনেই করে থাকে। আজকের এই রায় স্ত্রীর অধিকার বাড়ায়নি বা কমায়নি।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (The Muslim Family Laws Ordinance, 1961) এর ৬ ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে কোনো পুরুষ তার বর্তমান বিবাহ বলবৎ থাকা অবস্থায়, সালিশী পরিষদের (Arbitration Council) লিখিত পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে অন্য কোনো বিবাহ করিবেন না এবং এই অনুমতির জন্য নির্ধারিত ফী জমা দিয়ে নির্ধারিত পদ্ধতিতে চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন করতে হবে এবং উক্ত আবেদনপত্রে প্রস্তাবিত বিবাহের কারণ, প্রয়োজনীয়তা ও এ বিবাহে বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীগণের সম্মতি আছে কিনা, তা উল্লেখ করতে হবে।
আবেদনপত্র পাওয়ার পর চেয়ারম্যান আবেদনকারী এবং তার বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীগণকে তাদের নিজ নিজ প্রতিনিধি মনোনয়ন করতে বলবেন এবং উক্ত প্রতিনিধিগণকে নিয়ে সালিসী পরিষদ গঠিত হবে।
সালিশী পরিষদ যদি মনে করেন যে, প্রস্তাবিত বিবাহটি প্রয়োজনীয় এবং ন্যায়সঙ্গত (Necessary and Justified), তা হলে তারা লিখিত অনুমতি দিতে পারবেন এবং এই সিদ্ধান্তের কারণসমূহ লিপিবদ্ধ করবেন।
আর যদি কেউ সালিশী পরিষদের অনুমতি ছাড়াই ২য় বিয়ে করেন, তাহলে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এবং দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এ তাদের শাস্তির বিধান রয়েছে। তাই , মনোরম সংবাদের শিরোনামে মনের মধ্যে লাড্ডু যতই ফাটুক, বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন!
সানজিদা ইসলাম শেলী, আইনজীবী, ঢাকা জজ কোর্ট।
