বাংলাদেশে যখনই জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসে, রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে—সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে কি হবে না, নির্বাচন কমিশন কতটা নিরপেক্ষ, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া কতটা নিরাপদ—এসব প্রশ্নে তীব্র বিতর্ক দেখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই প্রস্তাব করেন, “আগে গণভোট হোক”—জনগণই ঠিক করুক তারা বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় কি না, কিংবা নির্বাচনের ধরন কী হবে। প্রশ্নটা তাই উঠতেই পারে: জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের আদৌ প্রয়োজন আছে কি?
গণভোট (Referendum) হলো এমন এক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট প্রশ্নে তাদের মতামত প্রকাশ করে। সাধারণ নির্বাচন যেখানে রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর প্রতি আস্থা নির্ধারণ করে, গণভোট সেখানে জনগণের নীতিগত মত প্রকাশের হাতিয়ার।
বিশ্বের অনেক দেশে গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণে গণভোট ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ—যুক্তরাজ্য ২০১৬ সালে গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করেছিল তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে কি না (Brexit)।ফ্রান্স ও ইতালি-তে সংবিধান সংশোধন বা প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তনেও গণভোট হয়েছে।সুইজারল্যান্ড-এ তো প্রায় নিয়মিতভাবেই গণভোট হয়—প্রতিবছর বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যুতে জনগণের মতামত নেওয়া হয়।তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন, কারণ এখানে গণভোটের ব্যবহার সীমিত এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল।
বাংলাদেশের সংবিধানে “গণভোট” শব্দটি এক জায়গাতেই উল্লেখ আছে—অনুচ্ছেদ ১৪২(১এ)-এ।এখানে বলা হয়েছে, যদি সংবিধান সংশোধনের কোনো প্রস্তাব সংসদে গৃহীত হয়, তবে রাষ্ট্রপতি চাইলে সেটি গণভোটে দিতে পারেন।অর্থাৎ, সংবিধান সংশোধন ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে গণভোট আয়োজনের কোনো সাংবিধানিক সুযোগ নেই।এই ধারাটি থেকে পরিষ্কার যে, নির্বাচনের আগে বা সরকারের বৈধতা নির্ধারণে গণভোট আয়োজনের কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। রাষ্ট্রপতির এখতিয়ারও কেবল সংসদে গৃহীত সংশোধনী প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সীমিত।
তবে রাজনীতিতে বাস্তবতা অনেক সময় সংবিধানকে ছাড়িয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়—যেমন এখন নির্বাচনের আগে গণভোটের প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক।
নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবি সাধারণত ওঠে তখনই, যখন নির্বাচনের বৈধতা বা নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ থাকে।
- সরকারের অধীনে নির্বাচন না নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে—এ প্রশ্নই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বিতর্কিত।
- নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ওপর আস্থার সংকট অনেকের মনে তৈরি হয়।
- রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস এতটাই গভীর যে, কেউই অন্যের ঘোষণাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে মেনে নেয় না।
এই অবস্থায় কেউ কেউ মনে করেন, আগে যদি একটি গণভোট হয়—যেখানে জনগণ জানাবে তারা “বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় কি না”—তাহলে হয়তো রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হবে।
তবে প্রশ্ন হলো, এটি আদৌ বাস্তবসম্মত বা প্রয়োজনীয় কি না?
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।প্রথমবার ৩০ মে, ১৯৭৭ সালে-জিয়াউর রহমানের সময়ে। তখন প্রশ্ন ছিল: “আপনি কি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের প্রতি ও তার দ্বারা গৃহীত নীতি ও কর্মসূচির প্রতি আস্থাশীল?গণভোটে সরকার দাবি করেছিল ৯৮.৯ % ভোটার “হ্যাঁ” ভোট দিয়েছেন, যদিও এর স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ছিল।
দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নীতি ও কর্মসূচির বৈধতা যাচাইয়ের জন্য ছিল এই গণভোট। ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এরপর পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপি। ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসন থেকে প্রধানমন্ত্রীশাসিত সংসদীয় পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে বিল পাস হয়।
সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর ওই বিলে রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেবেন কি না, তা নির্ধারণে ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংসদীয় প্রজাতন্ত্রকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ ভোটার ‘না’ ভোট দেন।
গণভোটের ধারণাটি গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ—জনগণই রাষ্ট্রের মালিক, তাই কোনো সংকটময় প্রশ্নে তাদের সরাসরি মত নেওয়া যেতে পারে। নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের পক্ষে যেসব যুক্তি দেওয়া হয়, তা হলো—
জনমতের বৈধতা।জনগণ নিজেরাই জানাবে তারা কোন ব্যবস্থার অধীনে ভোট দিতে চায়। এতে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্ক কমবে। এছাড়াও আরেকটি কারণ হত্র পারে রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমন।বিরোধী দল ও সরকার উভয়ই জনমতের রায় মেনে নিতে বাধ্য হবে, ফলে সহিংসতা ও অস্থিরতা কমতে পারে।যদি একটি গণভোটে জনতা নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে বিদেশি পর্যবেক্ষক ও দাতা সংস্থাগুলোর চোখে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।জনগণকে সরাসরি নীতি নির্ধারণে যুক্ত করা হলে গণতন্ত্রের ভিত মজবুত হয়।
তবে বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, এ প্রস্তাবে রয়েছে নানা জটিলতা ও ঝুঁকি—
প্রথমত,সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা।সংবিধানে নির্বাচনের আগে গণভোটের কোনো বিধান নেই। এটি চালু করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে, যা সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছা ছাড়া অসম্ভব।
দ্বিতীয়ত,রাজনৈতিক অপব্যবহারের আশঙ্কা। ক্ষমতাসীন দল যদি গণভোট আয়োজন করে, তাহলে সেটি পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় ফলাফল “নিরপেক্ষ” নাও হতে পারে।
এছাড়াও আছে লজিস্টিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।একটি জাতীয় গণভোট আয়োজন করা ব্যয়সাপেক্ষ ও সময়সাপেক্ষ। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি, নিরাপত্তা, ভোটার তালিকা—সবকিছুই প্রায় নির্বাচনের মতো জটিল।
আগে গণভোট, পরে নির্বাচন—এই দুই ধাপের প্রক্রিয়া জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। মানুষ ভাবতে পারে, কোন ভোটটা আসল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশে সংকট মূলত অবিশ্বাস ও প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে আসে। গণভোট জনমত দেখাতে পারে, কিন্তু পারস্পরিক আস্থা তৈরি করতে পারে না।
বাস্তবতা বনাম রোমান্টিসিজম
গণভোট ধারণাটি যতই রোমান্টিক মনে হোক না কেন, বাস্তবে এটি কোনো রাজনৈতিক সংকটের যাদুকরি সমাধান নয়।
১৯৭৭ কিংবা ১৯৮৫ সালের গণভোট, পাকিস্তান আমলে ১৯৬০ ও ১৯৬২ সালের রেফারেন্ডাম, এমনকি অন্যান্য দেশে কিছু গণভোট—সবই দেখিয়েছে যে, ক্ষমতায় থাকা সরকার চাইলে গণভোটকে “জনসমর্থনের নাটকীয় প্রদর্শনীতে” রূপ দিতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যেখানে সংলাপের অভাব, আপসের মানসিকতা দুর্লভ, সেখানে গণভোটের মতো বড় আয়োজন হয়তো কেবল আরেকটি “বিতর্কের মঞ্চ” হয়ে উঠবে, সমাধানের নয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের মূল শিকড় গণভোট-অভাব নয়, বরং আস্থার অভাব। তাই সংকট নিরসনের বিকল্প পথ হতে পারে সংলাপ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
বাংলাদেশে বড় দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। প্রতিটি নির্বাচনের আগে দেখা যায়, একটি দল সরকারে থেকে নির্বাচনের আয়োজন করে, আরেকটি দল সেটিকে প্রত্যাখ্যান করে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস কাটাতে সবচেয়ে প্রয়োজন নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ রাজনৈতিক সংলাপ।
যেমন—নির্বাচন কমিশন গঠন, তফসিল ঘোষণা, ভোটগ্রহণের পদ্ধতি—এসব বিষয়ে দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি স্থায়ী সংলাপ ফোরাম গঠন করা যেতে পারে।এতে শুধু নির্বাচন নয়, বরং গণতন্ত্রচর্চার নিয়মিত ধারাবাহিকতাও বজায় থাকবে।
নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবি সাধারণত ওঠে তখনই, যখন মানুষ নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা হারায়। তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত—নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করা।নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংসদীয় কমিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে।
নির্বাচনকালীন সময়ে মাঠ প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন নিরপেক্ষ না থাকলে কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হয় না। এজন্য প্রার্থিতার সময়কালেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কিছু সময়ের জন্য নির্বাচন কমিশনের অধীনস্থ করা যেতে পারে—যাতে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কমে।
গণভোট বা নির্বাচন—দুটোই অর্থহীন হয়ে যায় যদি ভোটাররা সচেতন না হয়। তাই স্কুল-কলেজ পর্যায়েই নাগরিক শিক্ষা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংবিধানবোধ গড়ে তোলা জরুরি। জনগণ যদি জানে তাদের ভোটই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে, তবে কোনো গণভোটের প্রয়োজন পড়বে না।
সংক্ষেপে, গণভোটের দাবি শোনা যতটা নাটকীয়, তার চেয়ে অনেক বেশি টেকসই সমাধান লুকিয়ে আছে ধৈর্যশীল সংলাপ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক পরিপক্বতায়।কারণ, গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখে ভোট নয়—আস্থা।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ থেকে শিক্ষা
বিশ্বের উন্নত গণতন্ত্রগুলো গণভোটকে ব্যবহার করে শেষ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে, প্রথম পর্যায়ে নয়। যুক্তরাজ্য-এর Brexit গণভোট ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার প্রশ্নে, নির্বাচন নয়।চিলি বা দক্ষিণ আফ্রিকা গণভোটের মাধ্যমে নতুন সংবিধান গ্রহণ করেছে, কিন্তু নির্বাচনের আগে গণভোটের উদাহরণ সেখানে নেই।
বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে গণভোট চাওয়ার প্রবণতা মূলত রাজনৈতিক অবিশ্বাসের ফসল, গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার নয়।গণভোট একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক হাতিয়ার—কিন্তু তা তখনই ফলপ্রসূ, যখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষ, জনগণ সচেতন, এবং রাজনৈতিক দলগুলো ফল মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই পূর্বশর্তগুলো এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত নয়।
নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজন করা তাই বাস্তবতার চেয়ে আবেগতাড়িত প্রস্তাব। এটি নতুন বৈধতা তৈরি করতে পারে না, বরং নতুন বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে।
বরং প্রয়োজন—আস্থা ফিরিয়ে আনার সংলাপ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে জনগণের ভোটই চূড়ান্ত গণভোট হিসেবে বিবেচিত হবে।
মাহমুদ নেওয়াজ জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।
