মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সমগ্র জীবন ছিল ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিরুদ্ধে এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম, যেখানে ধর্মীয় নৈতিকতার বোধ এবং অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এক অভূতপূর্ব সমন্বয় খুঁজে পেয়েছিল। তিনি ছিলেন একজন স্ব-শিক্ষিত নেতা, যিনি ঔপনিবেশিক রীতিনীতি অথবা শহুরে অভিজাত রাজনীতির প্রতি কখনোই আস্থা রাখেননি। তাঁর নামের শুরুতে থাকা ‘মাওলানা’ উপাধিটি যেমন তাঁর ধর্মীয় পাণ্ডিত্য ও ইনসাফভিত্তিক ন্যায়ের দর্শনের প্রতীক ছিল, তেমনি ‘লাল মাওলানা’ আখ্যাটি তাঁর সমাজতান্ত্রিক চেতনা ও আমৃত্যু বিপ্লবী সংগ্রামের সাক্ষ্য বহন করে। তিনি জীবনে প্রচুর প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী হলেও কখনও ক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। এই মজলুম জননেতার ইতিহাস তাই কোনো সিংহাসনের কাহিনি নয়, বরং গ্রাম থেকে উত্থিত গণ-অভ্যুত্থানের এক ধারাবাহিক আখ্যান হিসেবে পরিচিত।
১৮৮০ সালে সিরাজগঞ্জের ধনপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল সীমিত, কিন্তু স্ব-শিক্ষার মাধ্যমে তিনি অর্জন করেছিলেন গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দর্শন। পিতৃহীন হওয়ার পর জীবন সংগ্রামের শুরুতে তিনি টাঙ্গাইলের কাগমারিতে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং পরে ময়মনসিংহের কালা গ্রামের একটি মাদ্রাসায়ও শিক্ষকতা করেছেন। ১৯১৭ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের বক্তৃতা শুনে অনুপ্রাণিত হওয়ার পর, ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ বিরোধী অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুভ সূচনা হয়। এরপর তিনি টাঙ্গাইলের সন্তোষে অত্যাচারিত কৃষকদের নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন এবং আমৃত্যু তৃণমূলের সঙ্গেই তাঁর যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ রাখেন।
ভাসানীর নামের সঙ্গে যুক্ত হওয়া ‘ভাসানী’ উপাধিটি তাঁর গণমুখী রাজনীতির জন্মলগ্নের প্রতীক বহন করে, যা তাঁর রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি রচনা করে। ত্রিশের দশকের শেষদিকে তিনি আসামের ঘাগমারায় বসবাসকারী বাঙালি কৃষকদের স্বার্থরক্ষার আন্দোলন শুরু করেন। ঐ এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে বন্যার কবল থেকে বাঙালি কৃষকদের রক্ষার জন্য তিনি স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে একটি বিশাল বাঁধ নির্মাণ করেছিলেন। এই সেবামূলক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ভাসান চরের সাধারণ জনগণ তাঁকে পরম শ্রদ্ধায় ‘ভাসানী সাহেব’ বলে অভিহিত করে, যা কালক্রমে তাঁর নামের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, তাঁর রাজনৈতিক বৈধতা কোনো রাষ্ট্রীয় বা দলীয় প্রতিষ্ঠান থেকে আসেনি, বরং এসেছিল সরাসরি নিপীড়িত মানুষের সেবা ও সংগ্রামের মাধ্যমে।
আসামে এই জনপ্রিয়তা অর্জনের পর ১৯৩৭ সালে তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং অচিরেই দলের আসাম শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। সে সময় আসাম সরকার বাঙালি বসতি স্থাপনে ভৌগোলিক সীমারেখা টেনে দিলে স্থানীয় অহমীয়রা ‘বাঙালি খেদাও’ আন্দোলন শুরু করে। ভাসানী তখন আসামের মুখ্যমন্ত্রী স্যার মোহাম্মদ সাদউল্লাহর সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষে লিপ্ত হন এবং দেশ বিভাগের সময়ও গোয়ালপাড়া জেলায় এই প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৭ সালে আসাম সরকার তাঁকে গ্রেপ্তারের পর শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেয় যে তিনি আসাম ছেড়ে চলে যাবেন, ফলস্বরূপ ১৯৪৮ সালের গোড়ার দিকে তিনি পূর্ব বাংলায় ফিরে আসেন। পূর্ব বাংলায় এসেও প্রাদেশিক মুসলিম লীগ নেতৃত্ব তাঁকে দূরে রাখলে তিনি দক্ষিণ টাঙ্গাইল উপ-নির্বাচনে জমিদার খুররম খান পন্নীকে পরাজিত করেন, কিন্তু প্রাদেশিক গভর্নর অসদুপায়ের অভিযোগে সেই ফলাফল বাতিল করে দেন।
মুসলিম লীগের নেতৃত্ব থেকে দূরে থাকা এবং নির্বাচন বাতিলের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা ভাসানীকে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে আরও দৃঢ়ভাবে দাঁড় করিয়ে দেয়। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ নেতৃত্বের ব্যর্থতা এবং দলের যুব সদস্যদের হতাশার সুযোগে ভাসানী এক নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরির উদ্যোগ নেন। ১৯৪৯ সালের ২৩-২৪ জুন ঢাকার স্বামীবাগের রোজ গার্ডেনে এক কর্মী সম্মেলনের মাধ্যমে তাঁর সভাপতিত্বে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ) নামে এক শক্তিশালী বিরোধী দল জন্মলাভ করে। এই দলটি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে এক নতুন জাতীয়তাবাদী এবং অসাম্প্রদায়িক গণ-আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপিত হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে গ্রেপ্তার এবং কারাবরণ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে ভাসানী নিজেকে সবচেয়ে প্রতিবাদী রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে এ.কে. ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতাদের সঙ্গে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট মোর্চা গঠন করেন। এই মোর্চা নির্বাচনে ২২৩টি আসন লাভ করে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে, যা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়। তবে এই বিজয়ের পর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তাঁর তীব্র মতবিরোধ শুরু হয়, যা বাঙালি রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মার্কিন সামরিক চুক্তি (সেন্টো-সিয়াটো) ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর পক্ষপাতের কারণে এই আদর্শিক দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে।
১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলন ছিল সেই আদর্শিক দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ এবং স্বাধীনতার স্বপ্নের প্রথম স্পষ্ট রাজনৈতিক ইঙ্গিত। এই সম্মেলনে ভাসানী শুধু রাজনৈতিক কর্মীদেরই নয়, সারা পৃথিবীর প্রগতিশীল লেখক, শিল্পী, ও গবেষকদের সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন। সেখানেই তিনি পাকিস্তানের শোষণনীতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ঐতিহাসিক ঘোষণাটি দেন: “যে পাকিস্তান আমাদের শোষণ করে, আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, সেই পাকিস্তানকে আমরা আসসালামু আলাইকুম জানাই”। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এই ‘আসসালামু আলাইকুম’ ঘোষণাটিই ছিল পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার অঙ্কুর, যা জাতিকে ভবিষ্যৎ স্বাধিকারের পথে চালিত করে। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এই দৃঢ় অবস্থান ভাসানীর কাছে ক্ষমতার চেয়ে নীতি ও আদর্শের গুরুত্বকে প্রাধান্য দেয়।
সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার প্রশ্নে আপসহীন থেকে ১৯৫৭ সালে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন, যা দলটিকে বামপন্থী প্রভাবমুক্ত করে একটি বিশুদ্ধ জাতীয়তাবাদী দলে পরিণত হতে সাহায্য করে। পদত্যাগের পর তিনি প্রগতিশীল ও বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে একত্রিত করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল সমাজতন্ত্র। এই দলটিই পরবর্তীতে আইয়ুব বিরোধী ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান সংগঠনে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করে, যা বাঙালি জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত মুক্তির পথ প্রশস্ত করে। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি জনগণের প্রতি সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য আহ্বান জানান এবং প্রবাসী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যার মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অনবদ্য অবদান নিশ্চিত হয়।
ভাসানীর রাজনীতি নিছক ক্ষমতা দখলের কৌশল ছিল না; এটি ছিল এক গভীর নৈতিক দর্শন, যা রাজনীতিকে জনগণের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার সংগ্রাম হিসেবে দেখতো। তাঁর বিখ্যাত আহ্বান “মজলুম জনতা এক হও” ছিল সমাজতান্ত্রিক মানবতাবাদের এক বাস্তব প্রয়োগ, যেখানে ধর্মকে বিভাজনের হাতিয়ার না বানিয়ে ইনসাফভিত্তিক ন্যায়ের দর্শন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এই নৈতিক রাজনীতিই তাঁকে ‘মাওলানা’ উপাধি ধারণ করেও ‘লাল মাওলানা’ হিসেবে পরিচিত হতে সাহায্য করেছিল, যা ধর্মীয় নেতৃত্ব ও জনকল্যাণের সংযোগ স্থাপন করে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে কৃষক সমাজের সকল দুঃখ-কষ্টের পূর্ণ অবসান ঘটাতে পারে একমাত্র সমাজতান্ত্রিক ভূমি ব্যবস্থা।
তাঁর ইসলামী সমাজতন্ত্রের ধারণা প্রথাগত কমিউনিজম থেকে ভিন্ন ছিল, কারণ তিনি পুঁজিবাদকে নৈতিকভাবে সমালোচনা করতেন। তিনি ব্যক্তিগত সম্পত্তি (যেমন বাসস্থান) এবং সমাজে বিদ্যমান ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য টেনেছিলেন। তিনি পুঁজিবাদের মূল সমস্যা চিহ্নিত করে দেখিয়েছিলেন, উৎপাদনের উপকরণে ব্যক্তিগত মালিকানা থাকা ইসলামের গোড়ার তর্কের সঙ্গে সম্পর্কিত, কারণ এটিই সমাজের উৎপাদনের সম্পর্ক নির্ধারণ করে। তিনি যুক্তি দেন যে, ইসলাম প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি করে এবং শ্রমিকের উৎপাদিত মূল্যের সবটাই যাতে সে পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ইসলামী সমাজতন্ত্রের এই কাঠামোয় অক্ষম, ছিন্নমূল, ইয়াতীম, বিধবা ও বয়োবৃদ্ধদের প্রতিপালনের দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রের জন্য এক ফরজ বিধান। ভাসানী ইসলামী বিধানের উপর জোর দিয়ে বলেন যে যাকাত এবং বায়তুল মালের সাধারণ অর্থ সম্পদ যথেষ্ট না হলে ধনী ও সামর্থ্যবান নাগরিকদের উপর অতিরিক্ত অর্থ (ইনফাক) ব্যয়ের দায়িত্ব বর্তায়। এই দর্শন তাঁকে প্রথাগত সমাজতন্ত্রের রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের ঊর্ধ্বে স্থাপন করে, যেখানে তিনি মানবিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারকে ইসলামী নৈতিকতার সঙ্গে একীভূত করেন। ভাসানী কেবল রাজনৈতিক বিপ্লব চাননি, তিনি চেয়েছিলেন একটি সর্বাত্মক সাংস্কৃতিক বিপ্লব, যা সুখী, সমৃদ্ধ, ও শোষণহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য পূরণ করবে।
স্বাধীনতার পরও মজলুম জননেতার সংগ্রাম থামেনি; বরং তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নতুন করে গড়ে ওঠা শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে নৈতিক বিরোধীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ১৯৭৩ সালে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং খাদ্যশস্যের দুষ্প্রাপ্যতার প্রতিবাদে তিনি ঢাকায় আট দিন ধরে আমরণ অনশন করেন, যা তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভকে এক করে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আপোসহীন সংগ্রামের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পরই তিনি কাজি লেবুর রস পান করে অনশন ভঙ্গ করেন। এটি প্রমাণ করে যে তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রাম ক্ষমতার পালাবদলের জন্য ছিল না, বরং তা চিরকালই জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিবেদিত ছিলো।
বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা নিয়েও ভাসানীর শেষ গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন ছিল এক যুগান্তকারী পরিবেশগত দূরদর্শিতার ফস। ১৯৭৬ সালে ৯৬ বছর বয়সে তিনি ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চে নেতৃত্ব দেন, যা ছিল গঙ্গা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের এক বিশাল জনসমাবেশ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই বদ্বীপের নদীই তার প্রাণ এবং জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বর্তমানে পানি নিয়ে যে ভবিষ্যৎ সংকটের কথা বলছেন, তার টের তিনি সেই সময়েই পেয়েছিলেন। তিনি বাংলাকে পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত করার প্রতিবাদে ঘোষণা দেন, “শিশুর যেমন মায়ের দুধে অধিকার, পানির উপর তোমাদের তেমনি অধিকার”।
১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহী শহর থেকে শুরু হওয়া এই লংমার্চে লাখ লাখ মানুষ ‘ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দেও, মরণ বাঁধ ফারাক্কা’ স্লোগান তুলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের দিকে অগ্রসর হয়। ভাসানী সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে এই বাঁধের বিরুদ্ধে আন্দোলন না হলে ভবিষ্যতে এদেশ মরুভূমিতে পরিণত হবে। এই আন্দোলন তাঁকে কেবল জাতীয় স্বার্থের নেতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও পরিবেশগত দূরদর্শিতার একজন অগ্রদূত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। তাঁর এই সংগ্রাম দেখায়, মওলানা ভাসানী তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শোষণ, আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন ছিলেন।
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক আপোসহীন, দূরদর্শী এবং বিরল চরিত্র। তিনি একইসঙ্গে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন এবং সমাজতন্ত্রের আদর্শকে ইসলামী ন্যায়ের ভিত্তিতে স্থাপন করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন প্রমাণ করে যে ক্ষমতার কেন্দ্রকে প্রত্যাখ্যান করে তৃণমূলের মানুষের কাছেই একজন নেতার আসল শক্তি নিহিত থাকে। টাঙ্গাইলের সন্তোষে তাঁর বাসভবন এবং ঐতিহাসিক দরবার হল বাংলার কৃষক-শ্রমিকদের মুক্তির লড়াইয়ের এক চিরন্তন স্মারক হিসেবে আজও দাঁড়িয়ে আছে।
যদিও তাঁর প্রতিষ্ঠিত মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক প্রতিষ্ঠান তাঁর স্বপ্নের সাক্ষ্য বহন করে, তবুও সন্তোষের দরবার হলের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো আজ অবহেলায় জীর্ণ। এই অবহেলা আমাদের ইতিহাসের প্রতি বর্তমান প্রজন্মের উদাসীনতাকেই তুলে ধরে, যা এই মহান নেতার বিপ্লবী ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বের অভাব প্রমাণ করে। ভাসানীর দর্শন ও রাজনীতি আজকের দিনেও প্রাসঙ্গিক, কারণ তিনি দেখিয়ে গেছেন যে কোনো শোষণের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান নেওয়া এবং গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই একজন নেতার মূল দায়িত্ব। এই কারণেই ‘লাল মাওলানা’ ভাসানী ইতিহাসের পাতায় চিরন্তন মজলুম জননেতা হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন।
সাজিদ সামী চৌধুরী।লেখক,সম্পাদক, দ্য কমন রান।শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, চিটাগাং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি।
