গুম প্রতিরোধ আইন নিয়ে তালবাহানা কেন?
বাংলাদেশে গত দেড় দশকে ‘গুম’ কেবল একটি শব্দ ছিল না, এটি ছিল একটি রাষ্ট্রীয় ত্রাসের নাম। চৌধুরী আলম থেকে ইলিয়াস আলী—অগণিত মানুষ মাঝরাতে হারিয়ে গেছেন, যাদের হদিস আজও মেলেনি। জুলাই বিপ্লবের পর যখন অন্তর্বর্তী সরকার গুম প্রতিরোধে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে অধ্যাদেশ জারি করল, তখন সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো জেগেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সেই অধ্যাদেশকে পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপ না দিয়ে বরং ‘ল্যাপস’ বা বাদ দেওয়ার যে আলোচনা চলছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।এর মাধ্যমে দায়মুক্তির পুরনো সংস্কৃতি কি ফিরে আসছে?
সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেখানো হচ্ছে যে, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে গেলে সরকারের পূর্বানুমতি লাগবে। এখানেই প্রশ্ন ওঠে বিগত ১৫ বছর ধরে গুমের শিকার পরিবারগুলো কেন বিচার পায়নি? কারণ, এই ‘পূর্বানুমতি’র দেওয়াল টপকানো সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। যখন রক্ষকই ভক্ষক হয়, তখন সেই রক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে তার নিজের প্রতিষ্ঠানের অনুমতি চাওয়া মানেই হলো অপরাধীকে আগাম ‘দায়মুক্তি’ দেওয়া।
জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার দোহাই দিয়ে গুমকে সংজ্ঞায়িত করা বা তদন্তে বাধা দেওয়া হবে এক ধরনের ঐতিহাসিক ভুল। মনে রাখতে হবে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে না থেকেও কাজ করতে পারলে, মানবাধিকার কমিশন কেন পারবে না? তদারকির দোহাই দিয়ে একে মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখার চেষ্টা আসলে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতাকে খর্ব করার নামান্তর।
কেন গুম প্রতিরোধ আইন এখনই জরুরি?
* ভয়ের সংস্কৃতি উপড়ে ফেলা: গুম ছিল বিগত স্বৈরাচারী সরকারের প্রধান হাতিয়ার। কণ্ঠ রোধ করার এই কালো প্রথা চিরতরে বন্ধ করতে হলে এর সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন) নিশ্চিত করা এবং কোনো ধরনের বিশেষ অনুমতি ছাড়াই তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া জরুরি।
* জুলাইয়ের খুনিদের বিচার: এই আইন যদি আজ দুর্বল করা হয় বা সময়মতো পাস না হয়, তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যারা গুম ও খুনের সাথে জড়িত ছিল, তারাও আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। এটি হবে শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি।
* আন্তর্জাতিক মানদণ্ড: গুম থেকে সুরক্ষা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনের বিধানগুলো আমাদের আইনি কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করা কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং বৈশ্বিক মানবাধিকার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান পুনরুদ্ধারের একমাত্র পথ।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত ১৫ বছর ধরে যারা গুমের শিকার হয়েছে, সেই দলগুলোর মধ্য থেকেই যদি এই আইন পাসে অনীহা বা ধীরগতি দেখা যায়, তবে সেটি হবে চরম ট্র্যাজেডি। রাজনৈতিক সমঝোতা বা ‘উদারপন্থি ভাবনা’র নামে যদি অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হয়, তবে ইতিহাসে তা ‘‘খাল কেটে কুমির আনা’র শামিল হবে। আজ যারা ক্ষমতায় বা ক্ষমতার কাছাকাছি, তারা যদি মনে করেন এই শিথিলতা তাদের জন্য নিরাপদ, তবে তারা ভুল করছেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে কেউই রেহাই পাবে না।
সুতরাং গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশকে ঘিরে তালবাহানা বন্ধ করে দ্রুত আইনে রূপান্তর করতে হবে। ১৫ বছরের গুমের সুবিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া বাংলাদেশে টেকসই গণতন্ত্র কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
